সামান্য বা জাতির ক্ষেত্রে যে সকল ধর্ম বাধা স্বরূপ তা হল ‘জাতির বাধক’ বা ‘জাতিবাধক’। কাজেই জাতিকে জানতে হলে সামান্যের জাতিবাধক (Jati-badhaks of Generality or Universal) গুলি জানা প্রয়োজন।
সামান্যের জাতিবাধক | Jati-badhaks of Generality or Universal
সামান্য বলতে আমরা বস্তুর সাধারণ ধর্মকে বুঝে থাকি। যেমন দীপক, যদু, শ্যামল, মধু প্রভৃতি ব্যক্তি মানুষের মধ্যে নানা রকমের অভিন্নতা থাকলেও তাদের প্রত্যেকের মধ্যে এমন এক ধর্ম সমানভাবে বিদ্যমান, যার জন্য আমরা তাদের প্রত্যেককে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি, আর তা হল সামান্য বা জাতি।
মনুষত্ব হল মানুষ শ্রেণীর সামান্য বা জাতি। এই সামান্য বা জাতির ক্ষেত্রে বাধা স্বরূপ যেসব ধর্ম উপস্থিত থাকে সেগুলোই হল তাদের বাধক বা জাতিবাধক। অর্থাৎ যেসব লক্ষণ থাকার জন্য এই সমস্ত ধর্মকে জাতি বলা যায় না, সেই সমস্ত লক্ষণ গুলিই হল জাতিবাধক।
জাতিবাধক | Jati-badhaks
উদয়নাচার্য তাঁর ‘দ্রব্যকিরনাবলী’ গ্রন্থে ছয় প্রকার জাতিবাধকের কথা বলেছেন। সেগুলি হল –
১) ব্যক্তির অভেদ
২) তুল্যত্ব
৩) সঙ্কর
৪) অনবস্থা
৫) রূপহানি
৬) অসম্বন্ধ
ব্যক্তির অভেদ
যে ধর্মের আশ্রয় ব্যক্তি এক অর্থাৎ একাধিক নয়, সেই ধর্মকে জাতি বলা যায় না। যেমন আকাশত্ব, কালত্ব, দিকত্ব ইত্যাদি ধর্মগুলি বৈশেষিক মতে জাতি বলে মনে হলেও তা জাতি নয় বরং এগুলি হল জাতির বাধক।
কেননা আকাশত্বের আশ্রয় যে আকাশ তা একটি, একাধিক নয়। আবার কালত্বের আশ্রয় যে কাল সেটিও একটিমাত্র, তা একাধিক নয়। সুতরাং ব্যক্তির অভেদ অর্থাৎ একাধিক ব্যক্তি না থাকা হল জাতির বাধক।
জাতি হতে গেলে একাধিক অবস্থার সমন্বয় হতে হবে। কোন একটি মাত্র অবস্থাকে জাতি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। অনুরূপভাবে দিকত্ব ধর্ম এক ব্যক্তি মাত্রাবৃত্তি হওয়ায় জাতি হয় না এগুলি উপাধি।
তুল্যত্ব
যদি দুটি ধর্মের একই অধিকরণ হয় তাহলে ওই দুটি ধর্মকেই জাতি বলা যায় না। যেমন ঘটত্ব, কলসত্ত্ব একই অধিকরণে থাকার জন্য ওই দুটি ভিন্ন জাতি হয় না। তুল্যত্ব কথার অর্থ হল ‘সমান সমান’ যা বেশিও নয়, কমও নয়।
দুটি জাতির আশ্রয় যদি তুল্য হয় অর্থাৎ সমান সমান হয়, তাহলে সেখানে একটি জাতি স্বীকৃত হবে, দুটি নয়। ঘটত্ব যে সমস্ত বস্তুকে আশ্রয় করে থাকে, কলসত্ত্ব ও সেই সমস্ত বস্তুকে আশ্রয় করে থাকে।
সুতরাং ঘটত্ব ও কলসত্ত্ব কে দুটি ভিন্ন জাতি হিসেবে বিবেচিত করা যাবে না। বরং কোনো একটি জাতি হিসেবে নির্বাচিত করতে হবে। হয় ঘটত্ব নচেৎ কলসত্ত্ব। তুল্যত্ব জাতির বাধক নয়, কিন্তু জাতি ভেদের বাধক।
সঙ্কর
যদি দুটি ধর্ম পরস্পরের অভাবের অধিকরণে থাকে এবং এক অধিকরণেও থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে সংকর বলা হয়ে থাকে, তারা জাতি হয় না। যেমন ভূতত্ত্ব এবং মূর্তত্ব জাতি নয় তারা হল উপাধি।
ভূতত্ত্ব ও মূর্তত্ব – পৃথিবী, জল, বায়ু, তেজ এই চারটিতে একত্রে থাকে এবং তারা পরস্পরের অভাবের অধিকারনেও থাকে। মূর্তত্ত্বের অভাবের অধিকরণ আকাশে ভূতত্ত্ব থাকে। আবার ভূতত্ত্বের অভাবের অধিকরণ মনে মূর্তত্ব থাকে।
সুতরাং সঙ্কর হল জাতির বাধক। সঙ্কর ঘটলে কোন একটিকে জাতি বলা যাবে না।
অনবস্থা
ন্যায় বৈশেষিক মতে জাতিতে কোন জাতি থাকে না অর্থাৎ জাতির আর অন্য কোন জাতি হয় না। জাতিতে জাতি স্বীকার করলে অনবস্থার সৃষ্টি হয়। ঘটত্ব জাতি, পটত্ব জাতি এরূপ অনুগত প্রতীতি হওয়ায় ঘটত্ব বা পটত্ব জাতিতে জাতিত্ব বলে জাতি স্বীকার করলে অনবস্থা হয়।
এই অবস্থার জন্য জাতিকে জাতির আশ্রয় বলে স্বীকার করা হয় না।সুতরাং অনবস্থা দশ হলো জাতির বাধক জাতির জাতি অর্থাৎ জাতিত্ব কে স্বীকার করা যায় না যদি এমনটা করা হয় তাহলে তা অনবস্থা দোষে দুষ্ট হয়ে যাবে।
রূপহানি
রূপহানি কথার অর্থ হল কোনো পদার্থের স্বরূপের হানি। অর্থাৎ কোন কিছুর জন্য তার নিজস্ব রূপ বিনষ্ট হওয়া।
কোন পদার্থের জাতিকে স্বীকার করলে যদি সেই পদার্থের স্বরূপের হানি হয়ে থাকে তাহলে সেইরূপ জাতি হবে জাতির বাধক, তা কখনো জাতি হবে না।
বৈশেষিক মতে বিশেষত্ব বিশেষের অনুগত ধর্ম হলেও জাতি নয়, স্বতঃব্যবর্তক। বিশেষত্বকে জাতি বলে স্বীকার করলে বিশেষের স্বতঃব্যবর্তক রূপের হানি হয়ে থাকে। তাই বিশেষত্ব হল জাতিবাধক।
অসম্বন্ধ
অসম্বন্ধ কথার অর্থ হল ‘সম্বন্ধের অভাব’। আর এই সম্বন্ধের অভাবই হল জাতি হওয়ার বাধা স্বরূপ জাতিবাধক।
সমবায়ত্ব এবং অভাবত্ব এদুটি সমবায় ও অভাবের অনুগত ধর্ম হলেও তা জাতি নয়। কারণ সমবায় এবং অভাব কোনো পদার্থে সমবায় সম্বন্ধে থাকে না।
ন্যায় বৈশেষিক মতে জাতি ব্যক্তিতে সমবায় সম্বন্ধে থাকে। ঘট ব্যক্তির সহিত ঘটত্ব জাতির এক প্রকার সমবায় সম্বন্ধ থাকে আবার পট ব্যক্তির সহিত পটত্ব জাতিরও সমবায় সম্বন্ধ থাকে।এরূপ বিভিন্ন ক্ষেত্রের সমবায় সম্বন্ধের সমবায়ত্বকে স্বীকার করলে তা জাতিবাধক হয়ে যায়।
কারণ সমবায়ের সঙ্গে সমবায়ত্বের সম্বন্ধ হতে গেলে অতিরিক্ত কোন এক সমবায় সম্বন্ধ অস্বীকার করতে হয়। কিন্তু ন্যায় বিশেষিক একটিমাত্র সমবায় সম্বন্ধ স্বীকার করেছেন একাধিক নয়। কাজেই সম্বন্ধের অভাব থাকায় সমবায়ত্ব জাতি হতে পারে না তা জাতিবাধক হয়ে যায়।
উপরোক্ত এই ছয়টি জাতিবাধক না থাকলে কোনটি জাতি এবং কোনটি জাতি নয় তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। জাতি দ্রব্য, গুণ, কর্ম এই তিনটি পদার্থে থাকে। সামান্য, বিশেষ, সমবায় ও অভাবে জাতি থাকে না।
উপসংহার
পরিশেষে এ কথা বলা যায় যে সামান্য বা জাতির ক্ষেত্রে যে সকল বাধা রয়েছে সেগুলি চিহ্নিত করা এবং সামান্য বা জাতি হতে গেলে উপরোক্ত ছটি বাধাকে অতিক্রম করে তবেই কোন জাতি চিহ্নিতকরণ সম্ভব হবে। তাই সামান্যের জাতিবাধক (Jati-badhaks of Generality or Universal) গুলি সম্পর্কে জানা অত্যন্ত প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র (References)
- Classical Indian Philosophy: J.N. Mohanty
- Outlines of Indian Philosophy: M. Hiriyanna
- An Introduction to Indian Philosophy: D. M. Dutta & S.C. Chatterjee
- A Critical Survey of Indian Philosophy: C.D. Sharma
- Classical Indian Ethical Thought: K.N. Tewari
- The Ethics of the Hindus: S.K. Maitra
- Outlines of Indian Philosophy: J.N. Sinha
- Internet Source
প্রশ্ন – বৈশেষিক দর্শনে কয়টি জাতিবাদক স্বীকৃত হয়েছে?
উত্তর – বৈশেষিক দর্শনে ছয়টি জাতিবাধক স্বীকার করা হয় – ১) ব্যক্তির অভেদ ২) তুল্যত্ব ৩) সঙ্কর ৪) অনবস্থা ৫) রূপহানি ৬) অসম্বন্ধ
- Copi র যুক্তিবিদ্যার ১৯টি নিয়ম | Copi’s 19 Rules of Logic
- লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য | Locke’s primary and secondary qualities
- বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য | Difference between Science and Philosophy
- দ্রব্য সম্পর্কে লকের ধারণা | John Locke’s Concept of Substance Explained
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক আদর্শবাদ | Spiritual Idealism of Rabindranath Tagore




