লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য | Locke’s primary and secondary qualities

John Locke-এর মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের পার্থক্য (Locke’s primary and secondary qualities) এবং কোন গুণ বস্তুতে বাস্তবভাবে থাকে আর কোনটি ইন্দ্রিয়নির্ভর অনুভূতি তা সহজ ভাষায় সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা।

আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের অন্যতম প্রধান দার্শনিক জন লক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An Essay Concerning Human Understanding-এ জ্ঞানতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বস্তুর গুণাবলিকে মুখ্যগুণ (primary qualities) ও গৌণগুণ (secondary qualities)—এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। এই বিভাজনের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জ্ঞান কতটা বস্তুগত বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল তা ব্যাখ্যা করা। লকের মতে, সমস্ত গুণ সমানভাবে বাস্তব নয়।

মুখ্যগুণ কাকে বলে | What is primary qualities

যে গুণ বস্তুতে নিজস্বভাবে থাকে এবং মানুষের অনুভূতির উপর নির্ভর করে না, তাকে মূখ্যগুণ বলে।

বৈশিষ্ট্য

মুখ্যগুণ বস্তুতে বাস্তবভাবে থাকে। মানুষ দেখুক বা না দেখুক, মুখ্যগুণটি থাকবে।এটা ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করে না

উদাহরণ – আকার (Shape), সংখ্যা (Number), গতি (Motion), বিস্তৃতি (Extension), কঠোরতা / ঘনত্ব (Solidity)।

যেমন একটি বল গোলাকার, এই গোলাকার আকৃতি মানুষের উপর নির্ভর করে না।

গৌণগুণ কাকে বলে | What is secondary qualities

যে গুণ বস্তুতে নিজে থাকে না, কিন্তু মানুষের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভূত হয়, তাকে গৌণগুণ বলে।

বৈশিষ্ট্য

গৌণগুণ ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভরশীল।এই গুণগুলি মানুষের অনুভূতি ছাড়া প্রকাশ পায় না।বস্তু শুধু সেই অনুভূতি সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে।

উদাহরণ – রং (Color), স্বাদ (Taste), গন্ধ (Smell), শব্দ (Sound), উষ্ণতা / শীতলতা (Heat / Cold)।

যেমন লঙ্কা ঝাল লাগে, কিন্তু ঝাল আমাদের অনুভূতি।

লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য | Locke’s primary and secondary qualities

বস্তুবাদী জন লক তার যুগের বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা অনুসরণ করে বস্তুর দুই প্রকার গুণের উল্লেখ করেছেন। যথা- মুখ্যগুণ ও গৌণগুণ। লক (John Locke) নিম্নলিখিতভাবে মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্যগুলিকে (Locke’s primary and secondary qualities) নির্দেশ করেছেন –

মুখ্যগুণ বলতে লক সেই সব গুণকে বোঝান যা বস্তুতে বাস্তবভাবে, স্বতন্ত্রভাবে এবং অপরিবর্তনীয় রূপে বিদ্যমান। বস্তু যত ছোট অংশে বিভক্ত হোক না কেন, এই গুণগুলো লুপ্ত হয় না। মুখ্যগুণ বস্তুগত বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লকের মতে মুখ্যগুণগুলির মধ্যে বিস্তার, আকার, সংখ্যা, গতি, স্থিরতা এবং কঠোরতা অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, একটি পাথর ভেঙে ছোট টুকরো করা হলেও তার বিস্তার বা আকার সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয় না। তাই এই গুণগুলো বস্তুতেই বিদ্যমান থাকে, মানুষের মনে নয়।

অন্যদিকে, গৌণগুণ হলো সেই গুণ যা বস্তুতে সরাসরি বিদ্যমান নয়, বরং বস্তু আমাদের ইন্দ্রিয়ে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করার ক্ষমতা মাত্র। এই গুণগুলো বস্তুতে সম্ভাবনা হিসেবে থাকে, বাস্তব গুণ হিসেবে নয়। এগুলো মূলত মানসিক অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত।

গৌণগুণের উদাহরণ হিসেবে লক রং, স্বাদ, গন্ধ, শব্দ, উষ্ণতা ও শীতলতার কথা বলেছেন। যেমন, একটি আপেল লাল দেখায়, মিষ্টি লাগে—কিন্তু লকের মতে এই ‘লাল’ বা ‘মিষ্টি’ আপেলের ভেতরে বাস্তবভাবে নেই। এগুলো আমাদের চোখ ও জিহ্বার প্রতিক্রিয়া মাত্র।

লক আরও বলেন, গৌণগুণ পর্যবেক্ষকের উপর নির্ভরশীল। একই বস্তু ভিন্ন ব্যক্তির কাছে ভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। যেমন—একজনের কাছে দুধ গরম মনে হতে পারে, আবার অন্যজনের কাছে ঠান্ডা। এতে প্রমাণিত হয় যে গৌণগুণ আপেক্ষিক ও ব্যক্তিনির্ভর।

মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের (primary and secondary qualities) মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল—মুখ্যগুণ বস্তুগত ও নিরপেক্ষ, আর গৌণগুণ মানসিক ও আপেক্ষিক। মুখ্যগুণ বস্তু যেমন আছে তেমনই আমাদের মনে প্রতিফলিত হয়, কিন্তু গৌণগুণ বস্তু থেকে সরাসরি আসে না।

লকের মতে, মুখ্যগুণ থেকেই প্রকৃত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সম্ভব। কারণ এগুলো পরিমাপযোগ্য এবং সকলের কাছে একই রকম থাকে। গৌণগুণ বিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হতে পারে না, কারণ এগুলো ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হয়।

মুখ্য গুণ বস্তুর অবিচ্ছেদ্য গুন জড় বস্তু থেকে মুখ্যগণকে কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয় কোনো না কোনোভাবে তা থেকেই যায়।

অপরদিকে গৌণ গুণ হল বিচ্ছেদ্য। গৌণ গুণকে বস্তু থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন বা বিলুপ্ত করা সম্ভব। সুরোভিতো রঙিন মাখন বা মোমকে উত্তাপ দিলে তা তরল হয় বা মোমের পূর্বে বর্ণ ও গন্ধ তাতে থাকে না কিন্তু তার ও একটা আকার আয়তন ও ভার থেকেই যায়।

দ্রব্য সম্পর্কে লকের ধারণা (John Locke’s Concept of Substance) সম্পর্কে জানতে এই লিঙ্ক-টি ক্লিক করুন।

লক মনে করেন, আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত ধারণাগুলির উৎস হল বাহ্যিক বস্তু। কিন্তু বাহ্যিক বস্তুর সব গুণ আমাদের মনে একইভাবে প্রতিফলিত হয় না। কিছু গুণ বস্তুতে সত্যিই বিদ্যমান থাকে, আবার কিছু গুণ কেবল আমাদের অনুভূতির ফল। এই মৌলিক পার্থক্যের ভিত্তিতেই তিনি মুখ্যগুণ (primary qualities) ও গৌণগুণের (secondary qualities) ধারণা দেন।

আরোও পড়ুন – Click here

উপসংহার

সুতরাং লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য (Locke’s primary and secondary qualities) বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে এমনটা বলা যায় যে, জন লক (John Locke) মুখ্যগুণকে বস্তুর বাস্তব ও মৌলিক ধর্ম এবং গৌণগুণকে বস্তুর দ্বারা সৃষ্ট মানসিক অনুভূতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই বিভাজনের মাধ্যমে তিনি অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনে জ্ঞানের নির্ভরযোগ্যতা ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

তথ্যসূত্র (References)

  • An Introduction to Philosophical Analysis : J. Hospers
  • An Introduction to Philosophy : Shibapada Chakraborty
  • The Fundamental Questions of Philosophy: A. C Ewing
  • The Fundamentals of Philosophy: D. L. Das
  • Problems of Philosophy: G Watts Cunnigham
  • A History of Modern Philosophy: W. K. Wright
  • Internet Sources

প্রশ্ন – লক কে ছিলেন?

উত্তর – জন লক ছিলেন আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের অন্যতম প্রধান দার্শনিক।

প্রশ্ন – কোন গ্রন্থে John Locke মুখ্যগুণ ও গৌণগুণ তত্ত্ব আলোচনা করেন?

উত্তর – An Essay Concerning Human Understanding গ্রন্থে।

প্রশ্ন – মুখ্যগুণ (Primary Quality) কী

উত্তর – যে গুণ বস্তুতে বাস্তব ও স্বতন্ত্রভাবে বিদ্যমান থাকে।

প্রশ্ন – গৌণগুণ (Secondary Quality) কী?

উত্তর – যে গুণ বস্তু আমাদের ইন্দ্রিয়ের উপর প্রভাব ফেলে অনুভূতি সৃষ্টি করে।

প্রশ্ন – মুখ্যগুণ কেন বস্তুগত বলা হয়?

উত্তর – কারণ এগুলো পর্যবেক্ষকনিরপেক্ষভাবে বস্তুতেই বিদ্যমান।

প্রশ্ন – গৌণগুণ কেন মানসিক বলা হয়?

উত্তর – কারণ এগুলো ব্যক্তির ইন্দ্রিয় ও মনের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।

প্রশ্ন – মুখ্যগুণ কি পরিমাপযোগ্য?

উত্তর – হ্যাঁ, মুখ্যগুণ বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপযোগ্য।

প্রশ্ন – গৌণগুণ কি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভিত্তি হতে পারে?

উত্তর – না, কারণ এগুলো ব্যক্তিনির্ভর।

প্রশ্ন – মুখ্যগুণের উদাহরণ কী কী?

উত্তর – বিস্তার, আকার, সংখ্যা, গতি, স্থিরতা, কঠোরতা।

প্রশ্ন – গৌণগুণের উদাহরণ কী কী?

উত্তর – রং, স্বাদ, গন্ধ, শব্দ, উষ্ণতা ও শীতলতা।

Leave a Comment

✅ Copied with source!