দ্রব্য সম্পর্কে লকের ধারণা (John Locke’s Concept of Substance) অনুযায়ী, মানবজ্ঞান অভিজ্ঞতানির্ভর এবং দ্রব্য হল গুণাবলির এক অজানা ধারক।
দ্রব্য সম্পর্কে জন লকের ধারণা | John Locke’s Concept of Substance
জন লক (John Locke, ১৬৩২–১৭০৪) আধুনিক দর্শনের ইতিহাসে একজন যুগান্তকারী চিন্তাবিদ। তিনি অভিজ্ঞতাবাদী (Empiricist) ধারার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রধান গ্রন্থ “An Essay Concerning Human Understanding” (১৬৯০)-এ তিনি মানবজ্ঞান, বস্তুজগৎ ও দ্রব্যের ধারণা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেন। লকের মতে, মানবমস্তিষ্ক জন্মের সময় একেবারে খালি পাতা (tabula rasa) — অভিজ্ঞতাই এর একমাত্র উৎস। দ্রব্য সম্পর্কে তাঁর ধারণাও এই অভিজ্ঞতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই গঠিত।
লকের মতে, দ্রব্য হল এমন এক অজানা ধারক, যা বস্তুসমূহের গুণাবলিকে ধারণ করে রাখে। আমরা গুণাবলি জানি, কিন্তু দ্রব্যকে জানি না। অর্থাৎ লকের মতে, দ্রব্য (Concept of Substance) এমন এক অজানা ভিত্তি বা ধারক, যা বস্তুগুলোর সব গুণকে ধরে রাখে। আমরা রঙ, আকার বা গন্ধের মতো গুণ জানি, কিন্তু যে সত্তা এগুলো ধারণ করে, তাকে আমরা চিনি না।
দ্রব্যের ধারণার উৎস | The Origin of the Concept of Substance
আমরা চারপাশের জগতে বিভিন্ন বস্তু দেখি — তাদের রঙ, গন্ধ, আকার, ওজন, তাপমাত্রা ইত্যাদি নানা গুণ উপলব্ধি করি। এই গুণগুলো সবসময় একসঙ্গে থাকে বলে আমাদের মনে হয় যে, নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা এই গুণগুলোকে ধারণ করছে। সেই অজানা ধারক বা ভিত্তিকেই লক “দ্রব্য” (Substance) বলে অভিহিত করেন।
অর্থাৎ, দ্রব্যের ধারণা (Concept of Substance) হল এক ধরনের অনুমানমূলক ধারণা, যা আমরা গুণগুলির সমাবেশ দেখে মনের মধ্যে গড়ে তুলি।
দ্রব্যের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা | Ignorance of the Nature of Substance
লক স্পষ্টভাবে বলেন যে, আমরা দ্রব্যের প্রকৃতি সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমরা জানি কেবল গুণাবলি — কিন্তু যে সত্তা এই গুণাবলিগুলিকে ধারণ করছে, তা আমাদের জ্ঞানের বাইরে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—
“Substance is something, I know not what.”
(দ্রব্য এমন কিছু, যা আছে, কিন্তু আমি জানি না সেটি কী।)
অতএব, লকের মতে দ্রব্যের ধারণা অনুমাননির্ভর ও অস্পষ্ট।
দ্রব্যের প্রকারভেদ | Types of Substance
লক দ্রব্যকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন —
- ভৌত দ্রব্য (Material Substance): যেগুলো বাহ্যিক ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধ হয় — যেমন পাথর, গাছ, জল, আগুন ইত্যাদি।
- আত্মিক দ্রব্য (Spiritual Substance): যেগুলো চিন্তা, অনুভূতি ও চেতনার মাধ্যমে প্রকাশ পায় — যেমন আত্মা বা মন।
দুই ক্ষেত্রেই আমরা কেবল গুণ বা কর্মের মাধ্যমে তাদের চিনতে পারি; দ্রব্য নিজে অজানা থেকে যায়।
গুণ ও দ্রব্যের সম্পর্ক | The Relation between Quality and Substance
লক গুণকে দুই প্রকারে বিভক্ত করেন —
- প্রাথমিক গুণ (Primary qualities): আকার, সংখ্যা, গতি, ওজন ইত্যাদি — যা বস্তুতে স্থায়ীভাবে থাকে।
- দ্বিতীয় গুণ (Secondary qualities): রঙ, গন্ধ, স্বাদ ইত্যাদি — যা আসলে আমাদের ইন্দ্রিয়-অনুভূতির ফল।
এই দুই ধরনের গুণাবলি কোনো না কোনো ভিত্তিতে টিকে আছে — সেই ভিত্তিই “দ্রব্য”। কিন্তু আমরা সেই ভিত্তি নিজে অনুভব করতে পারি না, কেবল গুণের মাধ্যমেই তা অনুমান করি।
দ্রব্য ধারণার প্রয়োজনীয়তা | The Necessity of the Idea of Substance
যদিও দ্রব্যকে আমরা সরাসরি জানি না, তবুও লক বলেন যে “দ্রব্য” ধারণা চিন্তাগতভাবে অপরিহার্য (conceptually necessary)।
কারণ, যদি গুণাবলির কোনো ধারক না থাকে, তবে গুণগুলোকে অস্তিত্ব দেওয়া সম্ভব নয়।
অতএব, দ্রব্য ধারণা জ্ঞানের সংগঠন ও বাস্তবতার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।
দ্রব্য সম্পর্কে লকের সংশয়বাদ | Locke’s Skepticism about Substance
লক একদিকে দ্রব্যের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন (তিনি বস্তুবাদী নন), কিন্তু অন্যদিকে বলেন যে আমরা তার প্রকৃতি জানি না। এই দ্বৈত অবস্থানই তাঁর সংশয়বাদী বাস্তববাদ (Critical Realism)।
তিনি বাস্তবতার অস্তিত্ব স্বীকার করেন, কিন্তু জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মেনে নেন।
উদাহরণ | Example
যেমন, একটি আপেলের রঙ লাল, স্বাদ মিষ্টি, আকার গোল এবং ওজন আছে — এই সব গুণ একত্রে দেখে আমরা বলি, “এটা একটি আপেল।”
কিন্তু আসলে আমরা যা জানি, তা হলো এসব গুণ।
যে অজানা সত্তা এই গুণগুলিকে ধারণ করছে, সেটিই হলো আপেল নামক “দ্রব্য”, যা আমরা কখনো সরাসরি জানতে পারি না।
লকের দ্রব্য-ধারণার সীমাবদ্ধতা | The Limitations of Locke’s Idea of Substance
লকের এই ধারণা কিছু সমালোচনার মুখে পড়ে —
- তিনি দ্রব্যের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন, কিন্তু তার কোনো যুক্তি দেননি।
- জর্জ বার্কলে পরবর্তীকালে বলেন, যদি দ্রব্যকে জানা না যায়, তবে এর অস্তিত্ব মেনে নেওয়া অপ্রয়োজনীয়।
- লকের ধারণা অভিজ্ঞতাবাদী হলেও কিছুটা বিমূর্ত ও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
দার্শনিক গুরুত্ব | Philosophical Significance
তবুও লকের দ্রব্য-ধারণা (Concept of Substance) আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বে এক যুগান্তকারী ধাপ। তিনি প্রথম স্পষ্টভাবে দেখিয়েছিলেন যে, মানবজ্ঞান সীমিত এবং বস্তুজগত সম্পর্কে আমাদের ধারণা সবসময়ই অভিজ্ঞতার সীমার মধ্যে আবদ্ধ। তাঁর এই চিন্তাই পরবর্তী অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকদের (যেমন বার্কলে ও হিউম) চিন্তার ভিত্তি গড়ে দেয়।
সুতরাং জন লকের দ্রব্য ধারণা (Concept of Substance) অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর মতে, আমরা বস্তুগুলির গুণ অনুভব করি, কিন্তু যে সত্তা এসব গুণ ধারণ করে—সেই দ্রব্য আমাদের অজানা। তবুও এই ধারণা জ্ঞানের সংগঠন ও বাস্তবতার ধারাবাহিকতার জন্য অপরিহার্য।
উপসংহার
সবশেষে বলা যায়, লকের মতে দ্রব্য (Concept of Substance) কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিষয় নয়, বরং গুণাবলির ধারক হিসেবে একটি অনুমানমূলক ধারণা। আমরা গুণগুলিকে অনুভব করি, কিন্তু দ্রব্য নিজে কখনো অনুভব করতে পারি না।সুতরাং, দ্রব্য হলো “অজানা ধারক”, যা আমাদের জ্ঞানতত্ত্বে প্রয়োজনীয় হলেও অনুধাবনের সীমার বাইরে।
প্রত্যয় বা ধারণার উৎস | Source of Concept or idea সম্পর্কে জানতে এই লিঙ্ক-টি ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র (References)
- An Introduction to Philosophical Analysis : J. Hospers
- An Introduction to Philosophy : Shibapada Chakraborty
- The Fundamental Questions of Philosophy: A. C Ewing
- The Fundamentals of Philosophy: D. L. Das
- Problems of Philosophy: G Watts Cunnigham
- A History of Modern Philosophy: W. K. Wright
- Internet Sources
প্রশ্ন – লক কেন বলেন আমরা দ্রব্যকে জানি না?
উত্তর – কারণ আমরা কখনো দ্রব্যকে সরাসরি অনুভব করতে পারি না; আমরা কেবল গুণাবলি দেখি ও অনুভব করি। তাই লক বলেন—
“Substance is something, I know not what.”
অর্থাৎ, দ্রব্য আছে, কিন্তু তার প্রকৃতি আমরা জানি না।
প্রশ্ন – দ্রব্যের ধারণা কোথা থেকে আসে?
উত্তর – আমরা দেখি বিভিন্ন গুণ সবসময় একসঙ্গে থাকে—যেমন কোনো বস্তুর রঙ, গন্ধ, আকার, ওজন ইত্যাদি। এই গুণগুলোর ধারক হিসেবে আমাদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, নিশ্চয়ই কোনো “ভিত্তি” আছে—এটাই দ্রব্য ধারণার উৎস।
প্রশ্ন – লকের মতে দ্রব্যের প্রকারভেদ কী কী?
উত্তর – ১️⃣ ভৌত দ্রব্য (Material Substance): যেমন পাথর, গাছ, জল, আগুন—যা ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধ।
২️⃣ আত্মিক দ্রব্য (Spiritual Substance): যেমন আত্মা বা মন—যা চিন্তা ও চেতনার মাধ্যমে প্রকাশিত।
প্রশ্ন – গুণ ও দ্রব্যের সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন লক?
উত্তর – লক গুণকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন—
প্রাথমিক গুণ (Primary Qualities): আকার, সংখ্যা, গতি, ওজন ইত্যাদি।
দ্বিতীয় গুণ (Secondary Qualities): রঙ, গন্ধ, স্বাদ ইত্যাদি।
এই গুণগুলো কোনো না কোনো ধারকে নির্ভর করে থাকে—সেই ধারকই হলো দ্রব্য।
প্রশ্ন – লক কেন দ্রব্য ধারণাকে প্রয়োজনীয় বলেছেন?
উত্তর – লকের মতে, যদি গুণাবলির কোনো ধারক না থাকে, তাহলে গুণগুলোর অস্তিত্ব বোঝানো সম্ভব নয়। তাই দ্রব্য ধারণা চিন্তাগতভাবে অপরিহার্য, যদিও আমরা তার প্রকৃতি জানি না।
প্রশ্ন – দ্রব্য সম্পর্কে লকের সংশয়বাদ কী?
উত্তর – লক একদিকে দ্রব্যের অস্তিত্ব স্বীকার করেন, কিন্তু অন্যদিকে বলেন আমরা সেটি জানতে পারি না। এই অবস্থানকে বলা হয় সংশয়বাদী বাস্তববাদ (Critical Realism)—বাস্তবতা আছে, কিন্তু আমাদের জ্ঞান সীমিত।
প্রশ্ন – লকের দ্রব্য ধারণার সীমাবদ্ধতা কী কী?
উত্তর – তিনি দ্রব্যের অস্তিত্ব মানলেও কোনো যুক্তি দেননি।
বার্কলের মতে, যদি দ্রব্যকে জানা না যায়, তবে এর অস্তিত্ব মানা অপ্রয়োজনীয়।
লকের ধারণা কিছুটা বিমূর্ত ও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
প্রশ্ন – লকের দ্রব্য ধারণার দার্শনিক গুরুত্ব কী?
উত্তর – লকের চিন্তা মানবজ্ঞানকে অভিজ্ঞতার সীমায় বেঁধে দেয় এবং আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বে নতুন দিক উন্মোচন করে। তাঁর এই ধারণা পরবর্তী দার্শনিক জর্জ বার্কলে ও ডেভিড হিউম-এর চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
- Copi র যুক্তিবিদ্যার ১৯টি নিয়ম | Copi’s 19 Rules of Logic
- লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য | Locke’s primary and secondary qualities
- বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য | Difference between Science and Philosophy
- দ্রব্য সম্পর্কে লকের ধারণা | John Locke’s Concept of Substance Explained
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক আদর্শবাদ | Spiritual Idealism of Rabindranath Tagore




