দর্শনের স্বরূপ (The Nature of Philosophy) বলতে আমরা দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি, বিষয়বস্তু, তার আলোচনার পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়গুলিকে একত্রিকরণের মাধ্যমে সামগ্রিক আলোচনাকে বুঝি।
দর্শনের বিষয়বস্তু, সমস্যা, আলোচনার পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতি বিষয়গুলির আলোচনার মাধ্যমে দর্শনের স্বরূপ (The Nature of Philosophy) সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু ধারণা গঠন করা যায়।
দর্শনের স্বরূপ | The Nature of Philosophy
যেহেতু দর্শনের কোন একটি নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শনের সংজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে। এইসব বিষয় নিয়ে যারা আলোচনা করেন তাদের দার্শনিক বলা হয়। দর্শনের স্বরূপ (The Nature of Philosophy) ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন দার্শনিক তাদের বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন-
হার্বার্ট স্পেন্সার(Herbert Spencer), বার্টান্ড রাসেল (Bartrand Russell) প্রমুখ বস্তুবাদী দার্শনিকগণ মনে করেন, “দর্শন হলো ব্যাপকতর বিজ্ঞান”। দর্শনের কাজ হল বিভিন্ন বিজ্ঞানের ফলাফল গুলিকে ব্যাখ্যা করে তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। কিছু চিন্তাবিদ মনে করেন যে দর্শন ও বিজ্ঞান সম্পূর্ণ পৃথক। যেহেতু এদের পদ্ধতি ও আলোচনার বিষয় সম্পূর্ণ পৃথক।
প্লেটো(Plato), অ্যারিস্টটল(Aristotle) প্রমুখ দার্শনিক মনে করেন অধিবিদ্যাই হল দর্শন।
কিন্তু আধুনিক যুগে এ.জে.এয়ার(Alfred Jules Ayer)প্রমূখ দার্শনিক মনে করেন যে দার্শনিক আলোচনার ক্ষেত্রে অধিবিদ্যার কোন স্থান নেই। তাঁরা মনে করেন “দর্শন হল বিজ্ঞানের বচনগুলির তর্কশাস্ত্রসম্মত বিশ্লেষণ”।
ইমানুয়েল কান্ট(Immaniel Kant), জে. জি. ফিক্টে(Johann Gottlielo Fichte)প্রমুখ বিচারবাদী দার্শনিকরা মনে করেন যে দর্শন(Philosophy) ও জ্ঞানবিদ্যা(Epistemology) অভিন্ন।তারা মনে করেন “দর্শন হল জ্ঞানের তত্ত্ব বা বিজ্ঞান”। আবার অনেক চিন্তাবিদ বলেন জ্ঞানবিদ্যা হল দর্শনের একটি বিশেষ শাখা।
দর্শনের স্বরূপকে (The Nature of Philosophy) জানতে হলে দর্শনে বৈশিষ্ট্যকে বিশ্লেষণ করতে হয়। যেহেতু দর্শনের স্বরূপের (The Nature of Philosophy) মধ্যে দর্শনের লক্ষ্য, দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শনের বিষয়বস্তু, দর্শনের পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয় গুলি নিহিত। তাই বিষয়গুলির বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন এবং তা নিম্নলিখিত –
দর্শনের লক্ষ্য
দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো বিচার ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বস্তুকে এবং তার স্বরূপকে অনুসন্ধান করা। বস্তুর স্বরূপ বলতে বোঝায় তত্ত্ব। সুতরাং দর্শনের লক্ষ্য হলো তত্ত্বকে অনুসন্ধান এবং তত্ত্বকে বিচার করা। সত্যকে অনুসন্ধান করা এবং সমগ্র বিষয়বস্তুকে মূল্যায়ন করা ও তার ব্যাখ্যা দেওয়া হল দর্শনের লক্ষ্য এবং এই ব্যাখ্যা অবশ্যই উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যার সাথে দর্শনের ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কারণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সর্বতোভাবে যান্ত্রিক হয়ে থাকে। কিন্তু দর্শনের যে দার্শনিক ব্যাখ্যা তা একেবারে অযান্ত্রিক এবং ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে।
দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি
দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সামগ্রিক, সার্বিক তথা অখন্ড হয়ে থাকে। অন্যান্য বিষয়ের যেমন বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে যদি দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলনা করা হয়, সেক্ষেত্রে তা একেবারেই ভিন্ন রকমের হবে। কারণ বিজ্ঞান খণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রকৃতির এক একটি বিভাগ আলোচনা করে থাকে। পদার্থবিদ্যার যেমন আলোচ্য বিষয় জগত সংক্রান্ত, প্রাণিবিদ্যার আলোচ্য বিষয় প্রাণী জগৎ সংক্রান্ত আবার উদ্ভিদবিদ্যার আলোচ্য বিষয় উদ্ভিদ সংক্রান্ত। দর্শন কেবল জগৎ বা জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। সমগ্র ও সার্বিকভাবে, সমগ্র অংশকে আলোচনা করাই এর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য।
দর্শনের বিষয়বস্তু
জ্ঞান-বিজ্ঞান বা অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে যেমন প্রতিটি শাখার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু আছে। কিন্তু দর্শনের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নেই। কোন নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে দর্শন সীমাবদ্ধ নয়। সমগ্র জগৎ হল জ্ঞানের বিষয়। দর্শন জগৎ ও জীবন সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতার বিচার করে এবং তাকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করে থাকে। ফলোতো দর্শন সমস্ত রকমের বিষয়কে নিজের অধীনস্ত করতে সক্ষম।
দর্শনের পদ্ধতি
দর্শনের পদ্ধতি হলো বিচারমূলক এবং বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি। যে পদ্ধতি অন্যান্য রকম পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। বিজ্ঞানের পদ্ধতি হল আরোহমূলক পদ্ধতি। বিষয়বস্তুর পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণ সেখানে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। কিন্তু দর্শনের পদ্ধতি হলো বিচারমূলক পদ্ধতি। যেখানে বিষয়বস্তুকে বিশ্লেষণ ও সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। দর্শন তার পদ্ধতির দ্বারা বিষয়বস্তুকে যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় দর্শনের বিষয়বস্তু, সমস্যা, আলোচনার পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি নানান বিষয়গুলি আলোচনা করে দর্শনের স্বরূপ (The Nature of Philosophy) সম্পর্কে একরকমের প্রাথমিক ধারণা আমরা লাভ করে থাকি।
তথ্যসূত্র (References)
- History of Western Philosophy: B. Russell
- History of Modern Philosophy: R. Falckenberg
- A History of Philosophy: F. Thilly
- A History of Modern Philosophy: W.K. Wright
- Internet Sources
প্রশ্ন – দর্শন ও বিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক কি?
উত্তর – দর্শন যেমন কোন বিষয় এবং বস্তুকে জানতে ও তার জ্ঞান লাভ করতে তৎপর ঠিক তেমনি বিজ্ঞান ও দর্শনের মতোই একই পদ্ধতিতে তার জ্ঞান সমৃদ্ধিতে সচেষ্ট। তাই দর্শন ও বিজ্ঞানের পদ্ধতি কিছুটা একই রকম এবং তাদের মধ্যে এক প্রকার সুসম্পর্ক আছে বলা চলে। দর্শনের ক্ষেত্রে যেমন বিষয়বস্তুর পর্যবেক্ষণ পরীক্ষণ এবং মূল্যায়নের বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত থাকে তেমনি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এগুলি প্রযোজ্য। বিজ্ঞান ও দর্শন যেন একে অন্যের পরিপূরক তাদের।
প্রশ্ন – দর্শন পাঠের প্রয়োজনীয়তা কি?
উত্তর – দর্শন আলোচনার প্রধান বিষয় হল জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত। মানুষ হিসেবে আমাদের সকলেরই সবার আগে জীবন ও জগত এ দুটি বিষয় কে জানা অত্যন্ত আবশ্যক। যেহেতু দর্শনই একমাত্র যা জীবন ও জগত উভয় বিষয় নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন এবং তার সমাধানের মাধ্যম হিসেবে বিদ্যমান। যা পাঠ দ্বারা পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান লাভে সমর্থ্য হওয়া যায়।
প্রশ্ন – দর্শন কিভাবে মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত?
উত্তর –মানব জীবনের একটি পরিপূর্ণ এবং পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় হল দর্শন। দর্শন মানুষের বিচার-বুদ্ধি, চিন্তা-ভাবনাকে উন্নত এবং পরি কাঠামোগত করে গড়ে তোলে। মানুষের জ্ঞানপিপাসু উদ্বেগ এবং সমস্ত কিছুকে জানার আকাঙ্ক্ষায় ছুটে চলা মানব সত্তাকে সমস্ত প্রশ্নের মুখোমুখি এনে তার সমাধানের পথ খুঁজে দেওয়াই হলো দর্শনের মূল উদ্দেশ্য। যা মানুষের সমগ্রতার জ্ঞানকে পরিতৃপ্ত করে।
- Copi র যুক্তিবিদ্যার ১৯টি নিয়ম | Copi’s 19 Rules of Logic
- লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য | Locke’s primary and secondary qualities
- বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য | Difference between Science and Philosophy
- দ্রব্য সম্পর্কে লকের ধারণা | John Locke’s Concept of Substance Explained
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক আদর্শবাদ | Spiritual Idealism of Rabindranath Tagore




