শান্তি সম্পর্কিত দুটি ধারণা রয়েছে, একটি নেতিবাচক ও অন্যটি ইতিবাচক শান্তির ধারণা (Concept of Negative and Positive Peace)। সোজা কোথায় শান্তি বলতে আমরা মানুষের অহিংসা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার সাথে বসবাস করাকে বুঝি।
নেতিবাচক এবং ইতিবাচক শান্তি | Negative and Positive Peace
শান্তি হল এমন এক ব্যবস্থা যেখানে দ্বন্দ্ব ও সাম্প্রদায়িকতার অবসানের বহিঃপ্রকাশ। শান্তি কোনো স্থির বিষয় নয় তা হল চলমান একটি প্রক্রিয়া। মানব সমাজের যে চাহিদা তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও মূল্যবান চাহিদা হল শান্তির চাহিদা।
শান্তি এমন একটি অবস্থা যা সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি থেকে সমাজকে নিয়ত মুক্ত রাখে। অর্থাৎ শান্তি বলতে আমরা সংঘর্ষের অনুপস্থিতিকে বুঝি। যেখানে কোনরূপ দ্বন্দ্ব, সংঘাত বা অস্বস্তিকর অবস্থা থাকে না এবং জনসমষ্টি তাদের চাহিদা পরিপূর্ণ করতে পারে।
নেতিবাচক শান্তি
নেতিবাচক এবং ইতিবাচক শান্তির ধারণা শান্তির ধারণা (Negative and Positive Peace), এই ধরনের কথাগুলি বিশেষত আলোচনা করা হয় কোন দ্বন্দ্ব বা অশান্তির সমাধানের ক্ষেত্রে। তাছাড়া শান্তি বলতে বোঝায় সমস্ত যুদ্ধ বিরোধী ও সমস্ত হিংসা দ্বন্দ্বের থেকে এক প্রকার দূরে থাকা।
নেতিবাচক শান্তি হল এমন যা সংঘর্ষ ও হানাহানির অর্থাৎ দ্বন্দ্বের অনুপস্থিতি। সেক্ষেত্রে যুদ্ধের অভাব থাকাটা অত্যন্ত জরুরী। সমস্ত রকমের ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যক্তি, গোষ্ঠী ইত্যাদির শত্রুতা থেকে বিরত থাকা, যা হল নেতিবাচক শান্তি।
সমস্ত রকমের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত প্রতিরোধ করা হল নেতিবাচক শান্তির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।
যুদ্ধ বিরোধী এবং নানারকম চুক্তি, যে চুক্তি দুটি গোষ্ঠী বা দলের মধ্যে বা দুটি দেশের মধ্যে এক রকমের শত্রুতাকে বন্ধ করে, সমঝোতা কে প্রতিষ্ঠা করে।
নেতিবাচক শান্তি হল যুদ্ধরত দলগুলির মধ্যে একটি যুদ্ধ বিরোধী চুক্তি যা যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সর্বকামী হয়ে থাকে কিন্তু অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা গুলি সমাধান করে না যেগুলি সংঘর্ষের দিকে পরিচালিত করে
ইতিবাচক শান্তি
অন্যদিকে ইতিবাচক শান্তি হল এমন যা সমাজে সামাজিক ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা এবং সম্প্রীতির উপস্থিতিকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও মঙ্গলকে প্রতিষ্ঠিত করে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হল এই ইতিবাচক শান্তির লক্ষ্য।
ইতিবাচক শান্তি নিছক সহিংসতার অনুপস্থিতি। সরাসরি যুদ্ধ বা সহিংসতা নয় এমন পরিস্থিতি হল ইতিবাচক শান্তি।আসলে ইতিবাচক শান্তি হলো এমন যা সরাসরি নয় কিংবা কাঠামোগত সহিংসতার অনুপস্থিতি। দারিদ্র, বৈষম্য এবং বৈষম্যের মতো সংঘাতের মূল কারণগুলিকে মোকাবিলায় করা হল ইতিবাচক শান্তির উদ্দেশ্য। সম্পর্ক গড়ে তোলা, সম্প্রদায়ের প্রতিপালন এবং মানবাধিকারের প্রচার করা হল ইতিবাচক শান্তি।
এটি একটি ন্যায্য এবং ন্যায় সংগত সমাজ গঠনের জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার উল্লেখযোগ্য পথ।এই ইতিবাচক শান্তি হল একটি সম্প্রদায় উন্নয়ন কর্মসূচি যা অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলা করে, শিক্ষার প্রচার করে এবং বিশ্বাস ও সহযোগিতা গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে উৎসাহ প্রদান করে।
সুতরাং নেতিবাচক শান্তি ও ইতিবাচক শান্তির ধারণা (Negative and Positive Peace) থেকে এমনটা স্পষ্ট যে, পৃথকভাবে নেতিবাচক শান্তি অথবা ইতিবাচক শান্তিকে জানা বা সে সম্পর্কে ধারণা থাকাই মানুষের বাসযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বরং নেতিবাচক শান্তি ও ইতিবাচক শান্তির মধ্যে একপ্রকার সমন্বয় সাধন করাই হলো শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার একপ্রকার চাবিকাঠি।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, নেতিবাচক শান্তি হল যুদ্ধ এবং সহিংসতার অনুপস্থিতি সম্পর্কে ইতিবাচক এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যা প্রথমে গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যা গুলিকে মোকাবিলা করার মাধ্যমে সংঘাত সৃষ্টি হওয়া থেকে বিরত রাখা। অর্থাৎ নেতিবাচক এবং ইতিবাচক শান্তি (Negative and Positive Peace) দুয়েরই উপস্থিতি এবং তাদের সম্মিলিত রূপ হল সুস্থ এবং পরিপূর্ণ সমাজ গঠনের রূপকার।
তথ্যসূত্র (References)
- Conflict Resolution and Gandhian Ethics –Thomas Weber, Gandhi Peace Foundation, New Delhi, 1991.
- Peace Education: The Concept, Principles and Practices around the World – (eds.) Gabriel Solomon and Baruch Nevo, .
- Comprehensive Peace Education—Betty Reardon, Teachers College Press, 1988.
- Philosophical Perspectives of Peace – Howard P. Kainz
- Peace, War and Defence – (ed.) Johan Galtung
- Internet Sources
প্রশ্ন – শান্তির সংজ্ঞা দাও।
উত্তর – শান্তি বলতে এমন একটি সামাজিক অবস্থা বোঝায় যেখানে কোন প্রকার দ্বন্দ্ব, সংঘাত অথবা অস্বস্তিকর অবস্থা থাকে না এবং সেখানে জনসমষ্টি তাদের চাহিদা পরিপূর্ণ করতে পারে। সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি থেকে সমাজকে মুক্ত রাখাই হল শান্তি। স্বাভাবিকভাবে শান্তি বলতে আমরা সংঘর্ষের অনুপস্থিতি কে বুঝে থাকি।
প্রশ্ন – “শান্তি হল সন্ত্রাসের অনুপস্থিতি” উক্তিটি কার?
উত্তর – এই বিখ্যাত উক্তিটি হল Galtung এর।
- Copi র যুক্তিবিদ্যার ১৯টি নিয়ম | Copi’s 19 Rules of Logic
- লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য | Locke’s primary and secondary qualities
- বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য | Difference between Science and Philosophy
- দ্রব্য সম্পর্কে লকের ধারণা | John Locke’s Concept of Substance Explained
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক আদর্শবাদ | Spiritual Idealism of Rabindranath Tagore





শান্তির ধারণা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে নেতিবাচক এবং ইতিবাচক শান্তির পার্থক্য সম্পর্কে। নেতিবাচক শান্তি শুধুমাত্র সংঘাতের অনুপস্থিতিকে বোঝায়, কিন্তু ইতিবাচক শান্তি সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার দিকে কাজ করে। ইতিবাচক শান্তির মাধ্যমে সমাজে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও মঙ্গল অর্জন করা সম্ভব। এটি শান্তির স্থায়িত্ব এবং গভীরতা বোঝাতে সহায়ক। আপনি কীভাবে মনে করেন ইতিবাচক শান্তি অর্জনের পথে বাধাগুলো মোকাবিলা করা যায়?
ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য।
ইতিবাচক শান্তি অর্জনে বাধা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেসব বাধাকে অতিক্রম করতে কেবল একজনের পক্ষে তা সম্ভবপর নয়। সম্ভব তখনই হবে যখন সামগ্রিকভাবে সবাই জনগণ নির্বিশেষে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, অর্থ ইত্যাদি ভেদাভেদ দূরীকরণ করে দুর্নীতি, হিংসা ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সার্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে। তখনই ইতিবাচক শান্তি অর্জন করা সহজ হবে। বিভিন্ন উৎসবের মাধ্যমে সর্বধর্মের সমন্বয় ঘটিয়ে এবং বিশেষত মিডিয়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি দায়িত্বের সাথে এই ইতিবাচক শান্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা এবং মানুষকে তাতে অনুপ্রাণিত করতে উৎসাহী হবে তবেই ইতিবাচক শান্তির পথ প্রশস্ত হবে।
শান্তি সম্পর্কে এই আলোচনাটি খুবই গভীর ও চিন্তা-উদ্দীপক। নেতিবাচক ও ইতিবাচক শান্তির ধারণা সমাজের বিভিন্ন দিককে আলোকপাত করে। ইতিবাচক শান্তি কেবল সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্প্রীতির প্রতিষ্ঠা। এই ধারণাগুলি সমাজে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা ইতিবাচক শান্তির লক্ষ্য অর্জনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি?
ধন্যবাদ, আপনার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিবাচক শান্তি কেবলমাত্র সংঘর্ষ বা হিংসার অনুপস্থিতি নয় বরং ইতিবাচক শান্তি হল ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সহধর্মিতা ও সমতার মাধ্যমে এক উন্নয়নশীল এমন পরিবেশ গঠন করা যেখানে স্থায়ীভাবে শান্তিকে স্থিতিশীল করা যায়। এই ইতিবাচক শান্তি অর্জনের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন- শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এই স্থায়ী শান্তির অর্থাৎ ইতিবাচক শান্তির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে ছাত্রছাত্রী এবং জনসমাজে তা বিস্তৃত করার জন্য স্কুল-কলেজ ইত্যাদির শিক্ষায় তা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আবার বিভিন্ন সম্প্রদায়, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এই ইতিবাচক শান্তিকে অগ্রতর করা যায়। নারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজে সামাজিক ভারসাম্য গড়ে তুলতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে, দুর্নীতি রোধ ও অন্যায়কে ন্যায়বিচারে নিশ্চিতকরণ ও অপরাধের জবাবদিহির ব্যবস্থাকে দৃঢ় করতে হবে। এছাড়াও মূলত অন্যায় দূরীকরণ, বিভিন্ন বৈষম্যকে দূরীকরণ ও ন্যায় বিচারের মাধ্যমে সমগ্র সমাজকে আশ্বস্ত করা এবং সার্বিকভাবে সকলকে ইতিবাচক শান্তির লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য কি তা সম্পর্কে অবগত করা ইত্যাদি।