মানুষের জীবনের দুঃখ, বেদনা ইত্যাদির অনুভূতি থেকে মুক্ত হয়ে শরীর ও মনের তৃপ্ততাই হল শান্তি। শান্তির ধারনা (Concept of Peace) বলতে বোঝায় সমস্ত রকম সংঘর্ষ ও বিদ্বেষ মুক্তির চিন্তন।
শান্তির ধারণা | Concept of Peace
মানব সমাজ সর্বদা শান্তিকে কামনা করে। সংঘর্ষ বর্জন করে শান্তি গ্রহণ করা মানব জীবনের উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্য। তবে স্পষ্টতো, শান্তি সর্বদা বিরাজমান এমন বলা সম্ভব নয়। কারণ প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন রকম সংঘর্ষ, যুদ্ধ, আন্দোলন ইত্যাদি সর্বদা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত।
শান্তি কামনা মানবজাতির চরম লক্ষ্য। মানুষের মনুষত্ব সর্বদা শান্তির প্রতি অগ্রসর।শান্তি শব্দটির দ্বারা বিভিন্ন রকম শব্দ যেগুলো জড়িয়ে রয়েছে তা হলো পবিত্রতা, সহিষ্ণুতা, সহযোগিতা, সহানুভূতি ইত্যাদি। কারণ পবিত্রতা হল শান্তির একটি পথ। পবিত্রতা না থাকলে শান্তিকে অভ্যর্থনা করা অত্যন্ত কঠিন।
অপরদিকে সহিষ্ণুতাও শান্তির এক প্রকার পথনির্দেশক। কারণ মানুষ যদি সহিষ্ণু না হয় সেক্ষেত্রে শান্তি বিরাজমান থাকাটা একেবারে অসম্ভব। আবার অপরের গুনের কদর, সহযোগিতা ও সহানুভূতি ইত্যাদি এই সমস্ত গুণ বা বৈশিষ্ট্য গুলি যদি মানুষের মধ্যে না থাকে, তাহলে সে উগ্র হয়ে উঠবে। আর এই উগ্রতা থেকে আসবে হানাহানি, দ্বন্দ্ব, হিংসা, অন্যায়-অত্যাচার এবং নানা রকম সংগ্রামের সূচনা হবে এমন পরিপ্রেক্ষিতে।
তাই এই সমস্ত গুনগুলি মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তবেই শান্তি বিরাজমান হতে পারে।
বলা বাহুল্য এই শান্তি হল সর্বাঙ্গে মঙ্গল। অর্থাৎ যে অবস্থাতেই আমরা এবং আমাদের সমাজ সংস্কৃতি ভালো থাকবে সেটাই হল এক প্রকার শান্তি। এই শান্তি (Concept of Peace) শব্দটি ব্যবহার হয় তখনই, যখন কোনরূপ হিংসা এবং দ্বন্দ্ব, হানাহানি, অন্যায় নিপীড়ন ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকা যায়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই নানারকম যুদ্ধের যে আড়ম্বর, নানারকম কূটনীতি, অন্যায়, জোর দখল ইত্যাদি। প্রতিনিয়ত এক শ্রেণীকে গ্রাস করেছে অন্য এক শ্রেণী। সুতরাং এই সমস্ত বিষয়ে কখনো শান্তি বিরাজমান থাকেনি। কারণ শান্তি ও দ্বন্দ্ব একসাথে থাকাটা অসম্ভব। তাই শান্তি থাকলে দ্বন্দ্ব, হিংসা, যুদ্ধ এসমস্ত কিছু একেবারে থাকে না বললেই চলে।
চিরকাল সমাজ বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা সংগঠিত হয়েছে। এই সমস্ত গোষ্ঠী গুলি যখন শান্তির সুচী গ্রহণ করবে, একমাত্র তখনই শান্তি আসা সম্ভব হবে। কারণ গোষ্ঠী বিশেষত সমস্ত মানুষের সংঘটিত করে রাখে এবং সেই গোষ্ঠীর নিয়ম-নীতি গোষ্ঠীতে আবদ্ধ থাকা মানুষজনের নিয়ম নীতি হয়ে যায়।
কিন্তু গোষ্ঠীতে থাকা মানুষগুলি যখন গোষ্ঠীর আদর্শ অমান্য করে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় তখন তা আর শান্তি প্রতিষ্ঠায় সম্ভবপর হয় না।তাই শান্তি হল এমন একটি অবস্থার স্বরূপ যা সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং নানারকম অশান্ত পরিস্থিতি থেকে সমাজকে মুক্ত রাখে।
আমরা যদি ভারতীয় দর্শনের কথা বলি সেখানে শংকরাচার্য, শ্রী অরবিন্দ, চাণক্য, কুমারীল ভট্ট, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে পাশ্চাত্য দর্শনের সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, কান্ট, দেকার্ট, স্পিনোজা ইত্যাদি মহান ব্যক্তিত্বরা সবাই কিন্তু এই শান্তির পথে হেটেছেন।
কখনো কোন ভাবে তাঁরা অশান্তির বার্তা বয়ে আনেননি এবং তারা কখনোই সমাজকে উত্তেজিত ও অশান্ত হওয়ার বার্তা দেননি। প্রতিটা মহামানব, সমাজকে শান্তির পথে দৃঢ় থাকার কথা বলেছেন এবং সুশৃংখল সমাজ গঠনের কারিগর হয়ে উঠতে চেয়েছেন।
শান্তির কিছু ধারনা (Concept of Peace) গুলি নিম্নে উল্লেখিত হল –
- মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল শান্তিপ্রিয়তা। কারণ সহিষ্ণুতা, নমনীয়তা এবং সহনশীলতা ইত্যাদি যেমন শান্তির বৈশিষ্ট্য, তাই সভ্য মানুষ এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও তা।
- এই শান্তিই হল মানব জীবনের সমস্ত চাওয়া-পাওয়ার সবচেয়ে মূল্যবান একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। এই শান্তি বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব
- শান্তি হল এমন এক প্রাকৃতিক, সামাজিক অবস্থা যেখানে হিংসা ও হানাহানি অনুপস্থিত এবং যুদ্ধ যেখানে কাম্য নয়।
- যুদ্ধ-সন্ত্রাস যেগুলি সর্বদা পাপে পরিপূর্ণ এবং যা একেবারেই অবাঞ্ছিত। এইরকম সন্ত্রাসকে যেখানে দূরীকরণের প্রচেষ্টায় বিশ্বব্যাপী এক স্থিতিশীলতার কামনা সাধিত হয় তা হল শান্তি।
- শান্তি কেবল ব্যক্তি চাহিদা নয়। এই শান্তি সর্বাত্মক এবং গণতান্ত্রিক একপ্রকার উল্লেখযোগ্য চাহিদা, যা সমাজ এবং রাষ্ট্রের পক্ষে মঙ্গলময় এবং শুভাকাঙ্ক্ষী।
সুতরাং শান্তি (Concept of Peace) বলতে বোঝায় মূলত প্রত্যেক ব্যক্তি ও সমাজের সাংস্কৃতিক ও নৈতিকতার উন্নয়নকে। সামাজিক সংবিধান, বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন এবং সংগতিপূর্ণ জীবন যাপন হল শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল পরিবেশ। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তিকে আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। আর এই শান্তি হল আত্মা শান্তি, সমাজের শান্তি এবং সমগ্র বিশ্বের শান্তি। যা সভ্য সমাজের নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকেরই কাম্য হওয়া অত্যন্ত জরুরী এবং আবশ্যকও বটে।
উপসংহার
সবশেষে বলা যায় শান্তি হল সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক মঙ্গলকামী এক প্রকার বিষয়। এই শান্তি সর্বদা ব্যক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। তাই এই শান্তির ধারণা (Concept of Peace) প্রত্যেক মানুষের জানার বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করা একান্ত কাম্য।
তথ্যসূত্র (References)
- Conflict Resolution and Gandhian Ethics –Thomas Weber, Gandhi Peace Foundation, New Delhi, 1991.
- Peace Education: The Concept, Principles and Practices around the World – (eds.) Gabriel Solomon and Baruch Nevo, .
- Comprehensive Peace Education—Betty Reardon, Teachers College Press, 1988.
- Philosophical Perspectives of Peace – Howard P. Kainz
- Peace, War and Defence – (ed.) Johan Galtung
- Internet Sources
প্রশ্ন – Full form of IDC.
উত্তর – Interdisciplinary Courses.
প্রশ্ন –
উত্তর –
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy