যথার্থ এবং সুনিশ্চিত জ্ঞান রূপে দেকার্ত এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যাকে আর কোনভাবেই সংশয় করা যায় না – আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি (I think therefore I am)।
দেকার্তের একটি মূল উদ্দেশ্য ছিল যথার্থ এবং সুনিশ্চিত জ্ঞানলাভ করা। এই উদ্দেশ্যে তিনি সব কিছুর অস্তিত্ব সন্দেহ করতে লাগলেন। অবশেষে তিনি একটি বস্তু আছে যার অস্তিত্ব সম্বন্ধে আর সংশয় করতে পারলেন না সেটা হলো তার নিজের অস্তিত্ব।
আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি | I Think Therefore I am | Cogito ergo sum
আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি দেকার্তের এই বিখ্যাত উক্তি মনে করিয়ে দেয় যে চিন্তা করা মানে আমাকে বর্তমান থাকা অর্থাৎ আমি সেখানে উপস্থিত। যদি আমি না উপস্থিত থাকি তাহলে আমি চিন্তা করছি এ কথা বলা একেবারেই নিরর্থক।
আধুনিক বুদ্ধিবাদের তথা দর্শনের জনক হলেন রেনে দেকার্ত। আধুনিক বুদ্ধিবাদী দার্শনিক হিসেবে দেকার্তের লক্ষ্য হল দর্শনকে গণিতের সমতুল্য করা, যাতে দর্শনের গুণগুলি গণিতের বচনের মতন সমগ্র মানুষ তা স্বীকার করতে বা গ্রহণ করতে পারে।
দর্শনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাই দেকার্তের প্রথম এবং প্রধান কাজ হল এমন জ্ঞানের অনুসন্ধান করা যা সংশয়াতীতভাবে সত্য, যে বচনকে দর্শন আলোচনার প্রারম্ভিক মূল বচনরূপে, মূল ভিত্তিরূপে গ্রহণ করা যাবে। এমন এক সংশয়াতীত সত্য বচনের অন্বেষণেই আমাদের সমস্ত জ্ঞানকে অর্থাৎ ইন্দ্রিয়অভিজ্ঞতলব্ধ এবং বুদ্ধিলব্ধ জ্ঞানকেও সংশয় করেন তিনি।
দেকার্ত সমস্ত কিছুকে সংশয় করতে করতে শেষে এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ‘Cogito ergo sum’ যার ইংরেজি শব্দ হল ‘I think, therefore I am’ যার বাংলা অনুবাদ হল – ‘আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি’ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
দেকার্ত তার সংশয়কে প্রসারিত করে তিনি উপলব্ধি করেন যে একটি বিষয়ে আর সংশয় করা যায় না এবং সেই বিষয়টি হল নিজের অস্তিত্ব অর্থাৎ সংশয় কর্তার অস্তিত্ব।সংশয় কর্তার পক্ষে নিজের অস্তিত্ব অর্থাৎ ‘আমি আছি’ এই বিষয়টিকে সংশয় করা যায় না।নিজের অস্তিত্বে সংশয় করলে সেই সংশয় স্ববিরোধী এবং অর্থহীন হয়ে যায়।
দেকার্ত বলেন আমার সমস্ত বিশ্বাসকে সংশয় করা গেলেও ‘আমার সংশয়’ তাকে আর সংশয় করা যায় না। যদি সংশয় করতেই হয় তবে সেই সংশয় কর্তার অস্তিত্ব সেখানে প্রতিপাদিত হয়ে যায়। তাই আমার অস্তিত্বকে এখানে স্বীকার করতেই হবে তাকে অস্বীকার করা যায় না।
এভাবে সার্বিক সংশয়ের মাধ্যমে দেকার্ত সংশয়াতীত সত্য জ্ঞান রূপে ‘সংশয়কর্তা রূপে আমি আছি’ এই জ্ঞানে উপনীত হয়েছেন, যাকে তিনি ল্যাটিন বাক্যে প্রকাশ করেছেন ‘Cogito ergo sum’ ( I think therefore I am) – ‘আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি’।
‘আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি’ উক্তিটির স্বপক্ষে দেকার্ত কিছু যুক্তি দেন –
দেকার্ত বলেন ‘আমি চিন্তা করি’ এবং ‘আমি আছি’ কথা দুটি সংশোধনযোগ্য নয়, এগুলো সংশোধনাতীত। যদি কেউ বিশ্বাস করে যে – সে চিন্তা করছে অতয়েব সে আছে, তাহলে তার বিশ্বাস অবসম্ভব ভাবে সত্য হবে, তা সংশোধনের অতীত হবে।
দেকার্ত আরো বলেন উক্ত কথা দুটি স্বতঃ যাচাইযোগ্য বলে তিনি মনে করেন। যদি এমন হয় কেউ দাবী করে ‘আমি চিন্তা করি অতয়েব আমি আছি’ এই দাবি করা বাক্যটি সত্য বলে যাচাই হয়ে যায়। ‘আমি চিন্তা করি’ এবং ‘আমি আছি’ বাক্য দুটি স্বতঃই প্রমাণ হিসাবে আমাদের কাছে ধরা দেয়।এই দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য অন্য কোন কিছুর সাহায্য নেওয়ার দরকার পড়ে না।
‘আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি’ ( I think therefore I am) বচনটির তাৎপর্য
দেকার্ত সমস্ত কিছুর সংশয়াতীত যে সত্য উদঘাটন করেছেন সেই ‘সংশয়কর্তা রূপে আমি আছি’ অর্থাৎ ‘Cogito ergo sum’ বচনটি মাধ্যমে এক অভিনব দিক উদঘাটন করেছেন। তিনি সমস্ত কিছুকে সংশয় করার পরে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে আর সংশয় করতে পারেননি। তিনি বলেন কেবল আত্মমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতেই সুনিশ্চিত জ্ঞান লাভ সম্ভব। দেকার্তের জ্ঞানতত্ত্বের এটাই হল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বিষয়।
সেই সমকালীন এবং পরবর্তীকালীন অনেক দার্শনিক তার জ্ঞানতত্ত্বের অনুসরণ করেন। ‘আমি চিন্তা করি অতএব আমি আছি’ বচনটিতে এটাই বলা হয় যে জড় জগতের সমস্ত জ্ঞান অপেক্ষা মনোজগতের জ্ঞান অনেক বেশি সুনিশ্চিত। আমার কাছে নিজের মন সম্পর্কে জ্ঞান অপরের মন সম্পর্কে জ্ঞান অপেক্ষা বেশি সুনিশ্চিত।
উপসংহার
পরিশেষে এমন বলা যায় যে দেকার্তের সংশয়াতীত যে সত্য বচন অর্থাৎ চিন্তন কর্তা রূপে নিজে অস্তিত্ব ‘আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি’ যা একেবারেই সংশয় করা সম্ভব নয়। এটি এমন একটি সত্য যা সকল সংশয়ের ঊর্ধ্বে। এই মৌলিক সত্যটির বিষয় অর্থাৎ আমার অস্তিত্ব অতিশয় স্পষ্ট। এই কারণেই এটি স্বয়ংসিদ্ধ এবং সম্পূর্ণভাবে অন্য প্রমাণ নিরপেক্ষ। সুতরাং বলাই বাহুল্য এটি আমাদের সত্যতার নির্ণায়ক
তথ্যসূত্র (References)
- An Introduction to Philosophical Analysis : J. Hospers
- An Introduction to Philosophy : Shibapada Chakraborty
- The Fundamental Questions of Philosophy: A. C Ewing
- The Fundamentals of Philosophy: D. L. Das
- Problems of Philosophy: G Watts Cunnigham
- A History of Modern Philosophy: W. K. Wright
- Internet Sources
প্রশ্ন – দর্শন শাস্ত্রের আদি পুরুষ কে?
উত্তর – প্রাচীন দিক দর্শনের জনক থেলিস দর্শন শাস্ত্রের আদি পুরুষ হিসেবে পরিচিত।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy