কোনোরকম শর্তের উপর নির্ভর না করে দুটি পদের মধ্যে স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির সম্বন্ধ ঘোষণা করা হয় নিরপেক্ষ বচনে। নিরপেক্ষ বচন হল যুক্তি বিজ্ঞানের একটি অপরিহার্য অংশ। তাই প্রথমে জানা দরকার নিরপেক্ষ বচন কি (Concept of Categorical Proposition)।
নিরপেক্ষ বচন বলতে কী বোঝো | Concept of Categorical Proposition
যে বচনে দুটি পদের মধ্যে সম্বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং এই সম্বন্ধ কোন রকম শর্তের উপর নির্ভর করে না, তাকে শর্তনিরপেক্ষ বচন বা নিরপেক্ষ বচন (Categorical Proposition) বলে।
উদাহরণ: শ্যাম হয় বুদ্ধিমান ব্যক্তি।
যে বচনের উদ্দেশ্য ও বিধেয়র মধ্যে সম্বন্ধ অন্য কোন শর্তের উপর নির্ভর করে না, তাকে নিরপেক্ষ বচন (Categorical Proposition) বলে।
যেমন -‘সকল শিক্ষক হয় মানুষ’ এবং ‘কোন শিক্ষক নয় পূর্ণ’, বচন দুটির বিধেয় পদ দুটি উদ্দেশ্য সম্পর্কে শর্ত নিরপেক্ষভাবে যথাক্রমে স্বীকৃত বা অস্বীকৃত হয়েছে। এজন্য এই বচন গুলি হল নিরপেক্ষ বচন।
নিরপেক্ষ বচনে কারো সম্বন্ধে নিঃশর্তভাবে কোন কিছু বলা হয়। এই ক্ষেত্রে যার সম্বন্ধে কিছু বলা হয় এবং যা বলা হয় দুটি হল বিষয়। নিরপেক্ষ বচনে মাত্র দুটি বিষয় থাকে। এই বিষয় দুটির প্রত্যেকটি শব্দ হতে পারে আবার শব্দ সমষ্টিও হতে পারে। আর এই শব্দসমষ্টি বা শব্দকে পদ বলে।
এই নিরপেক্ষ বচনের বিষয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন শব্দ বা শব্দ সমষ্টিকে তাই পদ বলা হয়। নিরপেক্ষ বচনে এই পদ দুটির একটির সঙ্গে অন্যটির সম্বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই সম্বন্ধ স্বীকৃতির হতে পারে, আবার অস্বীকৃতির ও হতে পারে। যেমন – ‘জবা হয় লাল’, ‘জবা নয় লাল’।
নিরপেক্ষ বচনের বৈশিষ্ট্য
ক) যুক্তির অংশ বা অঙ্গ হল নিরপেক্ষ বচন (Categorical Proposition)।
খ) বিবৃতিমূলক বা ঘোষক বাক্যকে নিরপেক্ষ বচন বলা হয়। এক্ষেত্রে
i) দুটি পদ বা দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্বন্ধে ঘোষণা করা হয়।
ii) এই সম্বন্ধ স্বীকৃতির সম্বন্ধ হতে পারে আবার অস্বীকৃতিরও হতে পারে।
iii) এই সম্বন্ধ কোন প্রকার শর্তের উপর নির্ভর করে না।
গ) বচনে যা ঘোষিত হয় সেই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবের সঙ্গতি এবং অসঙ্গতি এসবের ভিত্তিতে বচনের সত্য ও মিথ্যা নির্ণয় করা হয়।
নিরপেক্ষ বচনের উপাদান
নিরপেক্ষ বচনে (Categorical Proposition) সাধারণত দুটি পদ এবং তাদের মধ্যবর্তী একটি সম্বন্ধ থাকে। সুতরাং একটি নিরপেক্ষ বচনকে বিশ্লেষণ করলে আমরা তিনটি উপাদান পাই –
উদ্দেশ্য পদঃ
কোন বচনের যে পদ সম্বন্ধে কিছু স্বীকার বা ঘোষণা করা হয় তাকে উদ্দেশ্য পদ বলে। যেমন – ‘কাক হয় কালো’। এই বচনটিতে ‘কাক’ সম্বন্ধে কোন কিছু ঘোষণা করা হচ্ছে তাই ‘কাক’ হল উদ্দেশ্য পদ।
বিধেয় পদঃ
কোন বচনের উদ্দেশ্য পদ সম্বন্ধে যা কিছু ঘোষণা করা হয় তাকে বিধেয় পদ বলা হয়। যেমন – ‘রাম হয় ভালো ছেলে’। এক্ষেত্রে বচনটিতে ‘রাম’ অর্থাৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে ‘ভালো ছেলে’ কথাটি বলা হয়েছে।তাই এখানে ‘ভালো ছেলে’ শব্দটি হল বিধেয় পদ।
সংযোজকঃ
কোন বচনে যে চিহ্নের দ্বারা উদ্দেশ্য ও বিধেয় পদের মধ্যবর্তী স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির সম্বন্ধকে প্রকাশ করা হয় তাকে সংযোজক বলে। যেমন – ‘মানুষ হয় সৎ’ এই বচনে সংযোজক হিসেবে হয় কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। এটি স্বীকৃতি সম্বন্ধকে প্রকাশ করেছে। আবার ‘মানুষ নয় সৎ’ – এই বচনে সংযোজক হিসেবে নয় কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। এটি একটি অস্বীকৃতির সম্বন্ধ।
সংযোজকের বৈশিষ্ট্য
সংযোজকের বৈশিষ্ট্য গুলি হল –
ক) সংযোজক উদ্দেশ্য পদ ও বিধেয় পদের মাঝখানে অবস্থান করে।
খ) সংযোজক স্বীকৃতির হতে পারে আবার অস্বীকৃতির ও হতে পারে।
গ) স্বীকৃতি সূচক সংযোজক হল হয়, হও বা হই। অস্বীকৃতি সূচক সংযোজক হল নয়, নও বা নই।
ঘ) উদ্দেশ্য ও বিধেয় এগুলো হল পদ। কিন্তু সংযোজক কোন পদ নয়। এটি কেবল দুটি পদের মধ্যবর্তী সম্বন্ধসূচক চিহ্ন মাত্র।
ঙ) সংযোজক সর্বদাই বর্তমান কালে থাকে। কোন বাক্যে অতীত বা ভবিষ্যতের কোন প্রসঙ্গ থাকলে বচন আকার দেখবার সময় ওই প্রসঙ্গটিকে বিধেয় পদের মধ্যে উল্লেখ করতে হয়। যেমন – রবীন্দ্রনাথ কবিগুরু ছিলেন এমন বাক্যকে যদি আমরা বচনের রূপান্তরিত করি তাহলে – রবীন্দ্রনাথ হন ব্যক্তি যিনি কবিগুরু ছিলেন।
আবার, ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি কোন বাক্য বলা হয় – রাহুল ঘুরতে যাবে। যদি বচনের রূপান্তরিত করি তাহলে হবে – রাহুল হয় ব্যক্তি যে ঘুরতে যাবে।
সংযোজকের কাজ
সংযোজক যেভাবে কাজ করে তা হল –
১) সংযোজকের মাধ্যমে বচনের উদ্দেশ্য পদ ও বিধেয় পদকে যুক্ত করা হয়।
২) উদ্দেশ্য পদ ও বিধেয় পদের মধ্যবর্তী যে স্বীকৃতিমূলক বা অস্বীকৃতিমূলক সম্বন্ধ, তাকে প্রকাশ করা হয় সংযোজকের মাধ্যমে।
৩) সংযোজকের মাধ্যমে বাক্য ও বচনের মধ্যে পার্থক্যকে তুলে ধরা হয়।
উপসংহার
সর্বশেষে আমরা এটা বলতে পারি যে নিরপেক্ষ বচন ছাড়া দুটি পদের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপন অসম্ভব। উদ্দেশ্য এবং বিধেয়র মধ্যে যদি সম্বন্ধ স্থাপন না হয়, তার ফলে বচনটির বৈধতা ও অবৈধতা নির্ণয় অসম্ভব হয়ে পরে। আবার উভয় পদের মধ্যে স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতিকেও বোঝানো সম্ভব হবে না। তাই যুক্তিবিজ্ঞানকে জানতে হলে নিরপেক্ষ বচন (Concept of Categorical Proposition) কি তা জানা দরকার।
তথ্যসূত্র (References)
- A Critical History of Modern Philosophy: Y.H. Masih
- A History of Philosophy: F. Thilly
- A History of Modern Philosophy: W.K. Wright
- A Critical History of Western Philosophy: D.J. O’Connor
- History of Western Philosophy: B. Russell
- History of Modern Philosophy: R. Falckenberg
- Internet Sources
প্রশ্ন – সংযোজক কি করে ?
উত্তর – বচনের উদ্দেশ্য পদ ও বিধেয় পদকে যুক্ত করা হল সংযোজকের কাজ।
প্রশ্ন – ‘O’ বচনের আবর্তন কি সম্ভব ?
উত্তর – ‘O’ বচনের আবর্তন সম্ভব নয়।
প্রশ্ন – যোজক এর উদাহরণ দাও।
উত্তর – ও, এবং, কিন্তু, আর, তবু, তাই ইত্যাদি হল যোজক এর উদাহরণ।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy
2 thoughts on “নিরপেক্ষ বচন বলতে কী বোঝো | Concept of Categorical Proposition”