পাশ্চাত্য দর্শনের আইরিশ দার্শনিক বিশপ বার্কলে হলেন আত্মগত ভাববাদের প্রতিষ্ঠাতা। বার্কলে তার আত্মগত ভাববাদ (Berkeley’s Subjective Idealism) লকের প্রতিরূপী বস্তুবাদের অসঙ্গতিকে সামনে রেখে সূচনা করেন।
বার্কলের আত্মগত ভাববাদ | Berkeley’s Subjective Idealism
যে মতবাদ অনুযায়ী আত্মা বা মনকে জগতের মূল সত্তারূপে গ্রহণ করা হয় এবং জড় বস্তু অপেক্ষা আত্মাই প্রাধান্য পায় বা জ্ঞেয় বস্তুর সত্তা মন নির্ভর বা জ্ঞান নির্ভর বলে গণ্য করা হয়, তাকেই ভাববাদ বলা হয়।
ভাববাদ | Idealism
ভাববাদ (Idealism) অনুসারে সকল জাগতিক বস্তু হল মনোগত। তার সত্তা সব সময় জ্ঞান ও চেতনার দ্বারা তৈরি হয়। বহির্জগতের যেসব বস্তু সম্বন্ধে আমরা জ্ঞান লাভ করি, আমাদের মনের অনুভূতি ছাড়া তাদের কোন অস্তিত্ব নেই। আমি এখন আমার পড়ার টেবিলে সামনে রাখা জলের বোতলটি দেখছি সেটি আমার জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। আমি বা জগতের অন্য কোন ব্যক্তি যদি এই জলের বোতলটি না দেখত তাহলে ‘বোতলটি অস্তিত্বশীল’ এ কথা বলা যেত না।
ভাববাদীদের মতে মন বা চৈতন্যই হল একমাত্র সত্য। চেতনার বাইরে কোন সত্তাকে তারা স্বীকার করেন না।
বার্কলের মতে জ্ঞেয় বস্তুর স্বতন্ত্র সত্তা নেই। জ্ঞেয় বস্তু হল জ্ঞাতার চেতনারই ধারণা। মন নিরপেক্ষ কোন জড়বস্তু নেই, তা হল মনের ধারণা মাত্র। বাহ্যবস্তু হল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কতগুলি গুণের সমষ্টি মাত্র এবং যাবতীয় গুণাবলী (যেমন মুখ্যগুন ও গৌণগুণ) মনের ধারনা মাত্র।
মানসিক ধারণার বহির্ভূত কোন সত্তা নেই। বার্কলে জড়বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। তার মতে জড় দ্রব্য মাত্রই কমবেশি ইন্দ্রিয়অভিজ্ঞতা সমূহের সমষ্টি। মন এবং তার অভিজ্ঞতা দ্বারাই সত্তা গঠিত অর্থাৎ যাবতীয় গুণ মনোগত এবং বস্তু জগত ব্যক্তিমনের ধারণা মাত্র।
আত্মগত ভাববাদ | Subjective Idealism
আত্মগত ভাববাদের (Subjective Idealism) মূল কথা হল জাগতিক সমস্ত জড়বস্তু মনের ধারনা মাত্র। বার্কলের মতে আমরা যাকে জড়বস্তু বলি সেটি তার অস্তিত্বের জন্য মনের উপর নির্ভরশীল।
তার মতে তথাকথিত জড়বস্তু মনের ধারণা হিসেবেই মন নির্ভর হয়ে থাকে, একারণে বার্কলের মতবাদকে আত্মগত ভাববাদ (Berkeley’s Subjective Idealism) বলা হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ধারণা শব্দটিকে বার্কলে মনোগত প্রত্যয় এই সাধারণ অর্থই গ্রহণ করেছেন।
লকের সঙ্গে বার্কলের পার্থক্য হল লক যে গুণের অতিরিক্ত অজ্ঞাত এক জড় দ্রব্যের কথা বলেন, বার্কলে সেই জড় দ্রব্যকে অস্বীকার করেন। বার্কলের মতে ‘দ্রব্য আছে কিন্তু প্রত্যক্ষ গোচর নয়’ – লকের এই উক্তি স্ববিরোধী।
যা আছে তাকে দেখা যাবে, অনুভব করা যাবে। যার প্রত্যক্ষ অনুভব নেই, অভিজ্ঞতাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তা সৎ নয়। এই তত্ত্বটি বার্কলে তার স্মরণীয় ল্যাটিন বাক্যে প্রকাশ করে বলেছেন ‘Esse Est Percipi’ অর্থাৎ অস্তিত্বের অর্থ হল প্রত্যক্ষ গোচর হওয়া। বা অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ নির্ভর।
ধারণা হল মনোমধ্যস্থ ধারণা। ধারণার অস্তিত্ব স্বীকার করলে মনের অস্তিত্ব মানতে হয়। অতএব বার্কলের মতে ধারণা আছে, মন আছে।
অভিজ্ঞতাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বার্কলে তার ভাববাদ প্রতিষ্ঠা করেন। অভিজ্ঞতায় সরাসরি আমরা যা পাই তা হল ধারণা। এসব ধারণাকে জড়বস্তুর ধারণা বলা চলে না, কেননা বস্তু প্রত্যক্ষ গোচর নয়। ধারণা বস্তুর গুণ ও নয়। ধারণা হল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য গুণের ধারণা, যখন অনুভূত হয় তখন তা ধারণা রূপে অনুভূত হয়। কঠিন বস্তুকে দেখে আমার মন কঠিন হয়ে যায় না। জলের শব্দ শুনে আমার মন তরল হয়ে যায় না। মনে শব্দের ধারণা হয়। এসব ধারণাই একমাত্র প্রত্যক্ষের বিষয়। অস্তিত্ব যখন প্রত্যক্ষ নির্ভর তখন ধারণাকেই একমাত্র সৎ বস্তু বলতে হয়।
এই প্রসঙ্গে বার্কলের সুবিখ্যাত উক্তি হল – ‘আকাশ ভরা গান আর পৃথিবীর সাজসজ্জা, এককথায় এই বিশ্বজগতের সমগ্র কাঠামো তাদের অস্তিত্বের জন্য মনের উপর নির্ভরশীল, মনের ধারণা রূপে তারা অস্তিত্ববান। বার্কলের এই মতবাদ দর্শনের ইতিহাসে আত্মগত ভাববাদ (Subjective Idealism) নামে পরিচিত।
অস্তিত্বশীলতা ও প্রত্যক্ষনীয়তা অভিন্ন, তাহলে ‘জড় বস্তু আছে’ একথা বলা যায় না। উপরন্তু লক যে মুখ্যগুণকে বস্তুধর্ম বলেছেন বার্কলে তাও অস্বীকার করেন। বার্কলে মনে করেন মুখ্যগুণ ও গৌণ গুণের মধ্যে প্রকৃত কোন পার্থক্য নেই। গৌণ গুণের অস্তিত্ব যেমন অনুভব সাপেক্ষ, মুখ্য গুণের অস্তিত্ব ও তেমন অনুভব সাপেক্ষ।
বার্কলের এই আত্মগত ভাববাদের (Berkeley’s Subjective Idealism) অনিবার্য পরিণতি হল অহং সর্বস্ববাদ। তার মতে বস্তুকে থাকতেই হলে তাকে কোন মনের দ্বারা জ্ঞাত হতে হবে।
সুতরাং যে বস্তুকে জানা যায় না, তার কোন অস্তিত্ব নেই। তিনি আরও বলেন, যাকে প্রত্যক্ষ করা যায় তারই অস্তিত্ব আছে এবং যার অস্তিত্ব আছে তাকে আমরা প্রত্যক্ষ করি।
বার্কলের মতে ঈশ্বরের মনের উপর নির্ভরশীল হয়ে বস্তু অস্তিত্ববান হয়। অস্তিত্ব হল প্রত্যক্ষগ্রাহ্য। এই মতবাদের মাধ্যমে বার্কলে আসলে জড়দ্রব্যের অস্তিত্ব খণ্ডন করেছেন। তার মতে যেহেতু জড় দ্রব্যের প্রত্যক্ষ করা যায় না, সেহেতু এর কোন অস্তিত্ব থাকতে পারে না। অর্থাৎ মননিরপেক্ষ জড় দ্রব্য রূপে কোন বস্তু থাকতে পারে না। যদিও প্রথমে বলেছিলেন যে বস্তুর অস্তিত্ব মনের উপর নির্ভরশীল তবুও পরবর্তীকালে তার এই আত্মগত ভাববাদে (Berkeley’s Subjective Idealism) বস্তুর ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বস্তুগত মন বা ঈশ্বরের ধারণায় পৌঁছেছেন। অর্থাৎ তিনি শেষ পর্যন্ত আত্মগত ভাববাদ (Subjective Idealism) থেকে বস্তুগত ভাববাদে (Objective Idealism) উপনীত হয়েছেন।
বার্কলের আত্মগত ভাববাদের সমালোচনা
- বার্কলের মতে আমরা যা কিছু প্রত্যক্ষ করি তা মনোমধ্যস্থিত ধারণা। কিন্তু মনোমধ্যস্থিত কথাটির অর্থ সুস্পষ্ট নয়। ধারণা মনোমধ্যস্থিত হলেও যে বিষয়টিকে নিয়ে ধারণা, সেটি মনের বাইরেও হতে পারে।
- অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ নির্ভর বার্কলের এই মূল তত্ত্বটি মানা যায় না। নব্য বস্তুবাদীরা কথাটিকে একটু ঘুরিয়ে বলেন, প্রত্যক্ষ অস্তিত্ব নির্ভর। অর্থাৎ বিষয়ের অস্তিত্ব আছে বলেই তা আমাদের মনে প্রত্যক্ষগোচর ধারণার সৃষ্টি করে। বস্তুর অস্তিত্ব প্রত্যক্ষনের উপর নির্ভর করে না, বরং প্রত্যক্ষই বস্তুর অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে।
- বার্কলের মতে মন এবং ধারণার অতিরিক্ত আর কিছুই নেই। জড় দ্রব্যকেই স্বীকার করায় লকের মতবাদের মধ্যে যে অপ্রাসঙ্গিকতা ঘটেছে, তা বার্কলে অনুধাবন করেছেন। কিন্তু জীবাত্মা ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করায় তিনি একই অসংগতির স্বীকার হয়েছেন।
- যদি সবকিছুই মনের ধারণা হয় তাহলে একথা বলতে হয় যে, ধারণাই আমাদের খাদ্য বস্তু, ধারণা আমাদের পানীয় এবং ধারণাই আমাদের পরিধেয়। বস্তুত এমনটা বলা সম্ভব নয়, একথা ভিত্তিহীন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যাকে প্রত্যক্ষ করা হয় তারই অস্তিত্ব আছে এবং যার অস্তিত্ব আছে তাকে আমরা প্রত্যক্ষ করি। তবে বার্কলের আত্মগত ভাববাদের (Berkeley’s Subjective Idealism) সমালোচনার মাধ্যমে এটাই প্রতিফলিত হয় যে বার্কলে প্রদত্ত আত্মগত ভাববাদ (Subjective Idealism) একটি ত্রুটিহীন ভাববাদ (Idealism) কখনোই নয়।
তথ্যসূত্র (References)
- An Introduction to Philosophical Analysis : J. Hospers
- An Introduction to Philosophy : Shibapada Chakraborty
- The Fundamental Questions of Philosophy: A. C Ewing
- The Fundamentals of Philosophy: D. L. Das
- Problems of Philosophy: G Watts Cunnigham
- A History of Modern Philosophy: W. K. Wright
- Internet Sources
প্রশ্ন – ‘ Cogito ergo sum‘ উক্তিটি কার?
উত্তর – ‘ Cogito ergo sum‘ এই বিখ্যাত উক্তিটি রেনে দেকার্ত এর।
প্রশ্ন – তিনটি ভাববাদী দার্শনিকের নাম লেখ।
উত্তর – তিনজন ভাববাদী দার্শনিক হলেন – প্লেটো, রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ প্রমূখ।
- Copi র যুক্তিবিদ্যার ১৯টি নিয়ম | Copi’s 19 Rules of Logic
- লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য | Locke’s primary and secondary qualities
- বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য | Difference between Science and Philosophy
- দ্রব্য সম্পর্কে লকের ধারণা | John Locke’s Concept of Substance Explained
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক আদর্শবাদ | Spiritual Idealism of Rabindranath Tagore




