বস্তুগত বিবর্তন হল সাধারণ বিবর্তনের বিপরীত একটি প্রক্রিয়া। বিবর্তনের নিয়ম গুলির উপর ভিত্তি করে এই বস্তুগত বিবর্তন (Material Obversion) কে প্রকৃত বিবর্তন বলা যায় না।
বস্তুগত বিবর্তন বলতে কি বোঝ | What is Material Obversion
অমাধ্যম অনুমানে হেতু বাক্যের অন্তর্গত পদ দুটির বস্তুগত অর্থের ওপর নির্ভর করে বিবর্তন করা হয়। এরুপ বিবর্তনকে বস্তুগত বিবর্তন (Material Obversion) বলে।
অর্থাৎ যে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় বচনের আকার গত বিবর্তন না করে কেবল তার অর্থের উপর নির্ভর করা হয় এবং অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বচনটি কে বিবর্তন করা হয়, তখন তাকে বস্তুগত বিবর্তন (Material Obversion) বলা হয়।
এপ্রকার বিবর্তনের ক্ষেত্রে যুক্তি বাক্যের উদ্দেশ্য পদ এর বিপরীত পদ সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হয় এবং বিধেয় পদের বিপরীত পদ সিদ্ধান্তের বিধেয় হয়। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এখানে যুক্তিবাক্য এবং সিদ্ধান্তের গুণের কোনো রূপ পরিবর্তন হয় না।
বস্তুগত বিবর্তনের নিয়ম
বস্তুগত বিবর্তন (Material Obversion) এর ক্ষেত্রে যে নিয়মগুলি প্রযোজ্য হয় সেগুলি হল – বস্তুগত বিবর্তনের বিবর্তনীয় বচনের উদ্দেশ্য পদের বিপরীত পদ বিবর্তিত বচনের উদ্দেশ্য পদ হয়। বিবর্তনীয় বচনের বিধেয় পদের বিপরীত পদ বিবর্তিত বচনের বিধেয় পদ হয়। বিবর্তনীয় ও বিবর্তিত বচন দুটির গুণ একই থাকে। অর্থাৎ বচন দুটি সদর্থক হবে অথবা বচন দুটি নঞর্থক হবে।
বস্তুগত বিবর্তনের দৃষ্টান্ত
বস্তুগত বিবর্তন হল এক ধরনের অনুমান যেখানে সিদ্ধান্তটি আশ্রয় বাক্যের বিপরীত।বস্তুগত বিবর্তনের দৃষ্টান্ত হল –
১ম উদাহরণ:
আশ্রয় বাক্য: ধর্ম হয় সততা (বিবর্তনীয় )
সিদ্ধান্ত: অধর্ম হয় অসততা (বিবর্তিত )
ব্যাখ্যা: বস্তুগত বিবর্তনের উপরোক্ত যুক্তিটি অবৈধ। কারণ যুক্তিতে বিবর্তনীয় বচনের উদ্দেশ্য পদ ‘ধর্ম’ এর বিপরীত পদ ‘অধর্ম ‘, বিবর্তিত বচনের উদ্দেশ্য পদ হয়েছে। আবার বিবর্তনীয় বচনের বিধেয় পদ ‘সততা’র বিপরীত পদ ‘অসততা’ বিবর্তিত বচনের বিধেয় পদ হয়েছে। গুণের পরিবর্তন হয়নি। দুটি বচনই সদর্থক হয়েছে। অর্থাৎ অনুমানটি প্রকৃত বিবর্তনের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে এবং বস্তুগত বিবর্তনের (Material Obversion) নিয়ম মান্য করেছে।
২য় উদাহরণ:
আশ্রয় বাক্য: জ্ঞানের প্রতীক হয় শুভ (বিবর্তনীয় )
সিদ্ধান্ত: অজ্ঞানের প্রতীক হয় অশুভ (বিবর্তিত )
ব্যাখ্যা: উক্ত যুক্তিটি বস্তুগত বিবর্তনের একটি দৃষ্টান্ত। এই অমাধ্যম যুক্তিটি বিবর্তনের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। কারণ এই ক্ষেত্রে বিবর্তনীয় বচনের উদ্দেশ্য পদ ‘জ্ঞানের প্রতীক’ এর বিপরীত পদ ‘অজ্ঞানের প্রতীক’, বিবর্তিত বচনের উদ্দেশ্য পদ হয়েছে। আবার বিবর্তনীয় বচনের বিধেয় পদ ‘শুভ’ এর বিপরীত পদ ‘অশুভ’ বিবর্তিত বচনের বিধেয় পদ হয়েছে। গুণের পরিবর্তন হয়নি। দুটি বচনই সদর্থক হয়েছে। এই অনুমানটিও প্রকৃত বিবর্তনের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। যুক্তিটি বস্তুগত বিবর্তনের (Material Obversion) নিয়ম গুলি অনুসরণ করেছে।
বস্তুগত বিবর্তন কি প্রকৃত বিবর্তন
বস্তুগত বিবর্তনের ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে তাহলে বস্তুগত বিবর্তন কি প্রকৃত বিবর্তন বলা যায় ? বস্তুগত বিবর্তন কে বেন এবং তার সহযোগীরা প্রকৃত বিবর্তন রূপেই গণ্য করেন। কারণ বস্তুগত বিবর্তনে একটি মাত্র যুক্তি বাক্য থেকে সিদ্ধান্তে একটি নতুন বচন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বস্তুগত বিবর্তন প্রকৃত বিবর্তন নয়
বস্তুগত বিবর্তন (Material Obversion) কে প্রকৃত বিবর্তন বলা যায় না।বিবর্তনের নিয়ম অনুসারে আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য অভিন্ন হবে কিন্তু এক্ষেত্রে উভয়ের উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়।
বিবর্তনের নিয়ম অনুসরণ করলে আশ্রয় বাক্যের বিধেয় পদের বিরুদ্ধ পদ সিদ্ধান্তের বিধেয় হয় কিন্তু বস্তুগত বিবর্তনে সিদ্ধান্তের বিধেয় পদ আশ্রয় বাক্যের বিধেয়র বিরুদ্ধ পদ না হয়ে বিপরীত পদ হয়ে থাকে।
বৈধ বিবর্তনের ক্ষেত্রে বাক্য ও সিদ্ধান্তের গুণ ভিন্ন হয়। কিন্তু বস্তুগত বিবর্তনের উভয়ের গুণ ভিন্ন হয় না। বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলে বস্তুগত বিবর্তন করা যায় না কিন্তু অবরোহ অনুমানে বাস্তব জ্ঞান প্রয়োজন হয় না কারণ অবরোহ অনুমানের লক্ষ্য আকারগত সত্যতা অর্জন করা বস্তুগত সত্যতা নয়।
বস্তুগত বিবর্তন কে যথার্থ বিবর্তন বলা যায় না। এই যুক্তিতে বিবর্তনের নিয়মগুলি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। অভিজ্ঞতা বা বাস্তব জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এই অনুমান করা হয়।
প্রকৃত বিবর্তনের ক্ষেত্রে বিবর্তনীয় বচনের উদ্দেশ্য পদ বিবর্তিত বচনের উদ্দেশ্য পদ হয়। কিন্তু বস্তুগত বিবর্তনে বিবর্তনীয় বচনের উদ্দেশ্য পদের বিপরীত পদ বিবর্তিত বচনের উদ্দেশ্য পদ হয়। এবং বিধেয় পদের বিপরীত পদ বিবর্তিত বচনের বিধেয় পদ হয়।
আবার প্রকৃত বিবর্তনে আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্তের গুণ ভিন্ন হয়। কিন্তু বস্তুগত বিবর্তনের ক্ষেত্রে আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্তের গুন অভিন্ন হয়। সুতরাং বস্তুগত বিবর্তন কে নিয়ম সঙ্গত বিবর্তন বলা যায় না।
এসব কারণে বস্তুগত বিবর্তন (Material Obversion) কে প্রকৃত বিবর্তন বলা যায় না।
বস্তুগত বিবর্তনের মূল ভিত্তি
বস্তুগত বিবর্তনের মূল ভিত্তি হল বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের উপর নির্ভর করে প্রদত্ত বক্তব্যের অর্থের পরিবর্তন। এই পরিবর্তন বক্তব্যের আকারগত পরিবর্তনের থেকে অর্থগত ব্যাখ্যার উপর জোর দেয়।
বস্তুগত বিবর্তন (Material Obversion) কোন প্রকৃত বিবর্তন নয়। এটি ঐতিহ্যবাহী যুক্তিবিদ্যার নিয়ম মেনে চলে না।ঐতিহ্যবাহী নিয়ম অনুসারে, বিবর্তনের মাধ্যমে সিদ্ধান্তের বিধেয় পদ আশ্রয় বাক্যের বিধেয় পদের বিপরীত হতে হবে।
কিন্তু বস্তুগত বিবর্তনে, বিধেয় পদ বিপরীত হয় না, বরং বিপরীত অর্থ বহন করে।তাই, বস্তুগত বিবর্তনকে ঐতিহ্যবাহী যুক্তিবিদ্যার বাইরে একটি নিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বস্তুগত বিবর্তন স্বীকার করেছেন
এই পদ্ধতির উদ্ভাবক হলেন তর্কবিদ বেন (Bain)। তর্কবিদ বেন এই প্রকার বিশেষ বিবর্তনের কথা স্বীকার করেন।বেন এবং তার অনুগামীরা বস্তুগত বিবর্তন কে প্রকৃত বিবর্তন রূপেই মনে করেন। কারণ বস্তুগত বিবর্তনে একটি মাত্র যুক্তি বাক্য থেকে সিদ্ধান্তে একটি নতুন বচন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
উপসংহার
বস্তুগত বিবর্তন (Material Obversion) যুক্তিবিদ্যায় একটি বিতর্কিত নিয়ম। ঐতিহ্যবাহী নিয়ম মেনে না চললেও, এটি বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান ব্যবহার করে বাক্যের অর্থের পরিবর্তন করার একটি মাধ্যম রূপে কাজ করে।
তথ্যসূত্র (References)
- History of Western Philosophy: B. Russell
- History of Modern Philosophy: R. Falckenberg
- A Critical History of Modern Philosophy: Y.H. Masih
- A History of Philosophy: F. Thilly
- Internet Sources
প্রশ্ন – বস্তুগত বিবর্তনের প্রবর্তক কে?
উত্তর – বস্তুগত বিবর্তনের প্রবর্তক হলেন তর্কবিদ বেন।
প্রশ্ন – বিবর্তনকে কেন অমাধ্যম অনুমান বলা হয়?
উত্তর – অমাধ্যম অনুমানের ক্ষেত্রে একটি মাত্র হেতুবাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি নিয়ম অনুসারে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়। বিবর্তনের ক্ষেত্রেও এরূপ একই হয়। তাই বিবর্তন কে অমাধ্যম অনুমানও বলা যায়।
প্রশ্ন – বস্তুগত বিবর্তনের একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর – বস্তুগত বিবর্তনের একটি উদাহরন হল –
উষ্ণতা হল কষ্টদায়ক (বিবর্তনীয় )
শীতলতা হল আরামদায়ক (বিবর্তিত )
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy