নিরপেক্ষ বচনের একটি অন্যতম বিষয় হল পদের ব্যাপ্যতা। যুক্তিবিজ্ঞানে আমরা বচনকে জেনেছি। বচনে পদের ব্যবহার ও জেনেছি। এখন পদের ব্যাপ্যতা কাকে বলে (What is Distribution of Terms) সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
পদের ব্যাপ্যতা কাকে বলে | What is Distribution of Terms
একটি নিরপেক্ষ বচনে দুটি পদ থাকে একটি উদ্দেশ্য এবং অপরটি বিধেয়। এই পদ দুটি কোনো না কোনো জাতিকে নির্দেশ করে। নিরপেক্ষ বচনে দুটি পদের মধ্যে স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির সম্বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি সার্বিক বা সামান্য হতে পারে আবার আংশিক বা বিশেষ হতে পারে। পদের ব্যাপ্যতা বলতে একটি পদের দ্বারা নির্দেশিত জাতির কতটুকু গ্রহণ করা হয়েছে তাকেই বোঝানো হয়। অর্থাৎ ব্যাপ্যতা বলতে পদ নির্দেশিত জাতির ব্যাপ্তির তারতম্যকে বোঝায়।
কোনো পদের সম্পূর্ণ ব্যক্তার্থকে যখন গ্রহণ করা হয় তখন পদটি ব্যাপ্য হয়। আর যখন কোনো পদের আংশিক ব্যক্তার্থকে গ্রহণ করা হয় তখন পদটি অব্যাপ্য হয়। এদের সমগ্র রূপকে বলা হয় পদের ব্যাপ্যতা।
যেমন – ‘সকল কবি হয় মানুষ‘ এই বচনটিতে ‘কবি’ শ্রেণীর সকল সদস্য ‘মানুষ‘ শ্রেণিভুক্ত। সেজন্য ‘কবি’ পদটি ব্যাপ্য।
আবার, ‘কোন কোন ফুল হয় লাল‘ এই বচনটিতে কোন কোন কথার দ্বারা বোঝা যাচ্ছে ‘ফুল’ এই উদ্দেশ্য পদটি অব্যাপ্য। কেননা কোন কোন ফুলকে লাল বলে ধরা হয়েছে। বিধেয় ‘লাল‘ এই পদটিও অব্যাপ্য। কেননা ‘লাল’ এর মধ্যে কোন কোন ফুলকে ধরা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সকল ফুল কে ধরা হয়নি।
বিভিন্ন প্রকার নিরপেক্ষ বচনের ব্যাপ্যতা
নিরপেক্ষ বচন চার প্রকার – ( A, E, I, O ) । পদের ব্যপ্যতার (Distribution of Terms) এই বিষয়টিকে আমরা নিরপেক্ষ বচনের চারটি ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি। সেগুলির প্রয়োগ নিম্নলিখিতভাবে আলোচিত হল –
‘সকল সাধু হয় মানুষ‘ – (A) এটি একটি সামান্য সদর্থক বচন। এই বচনের উদ্দেশ্য ‘সাধু’ পদটি ব্যাপ্য। কেননা সাধু বোঝাতে মানুষের সমগ্র অংশকে বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ যারা ‘সাধু’ তারা ‘মানুষ’ শ্রেণিভুক্ত। আবার উক্ত বচনে ‘মানুষ’ এই বিধেয় পদটি অব্যাপ্য। কেননা যারা মানুষ শ্রেণিভুক্ত প্রাণী তারা যে সবাই সাধু তা নয়। তাদের মধ্যে চোর, ডাকাত, বদমাশ ইত্যাদি প্রাণীও রয়েছে সুতরাং মানুষ পদের আংশিক ব্যক্তার্থকে ধরা হচ্ছে। তাই মানুষ পদটি অব্যাপ্য। সুতরাং A বচনে উদ্দেশ্য পদ ব্যাপ্য এবং বিধেয় পদ অব্যাপ্য।
‘কোন মানুষ নয় অমর‘ – (E) এটি একটি সামান্য নঞর্থক বচন । এই বচনের উদ্দেশ্য ‘মানুষ’ পদটি ব্যাপ্য। কেননা উদ্দেশ্য পদ নির্দেশিত সকল শ্রেণীকে অস্বীকার করা হচ্ছে। আবার বিধেয় পদ ‘অমর’ এটিও ব্যাপ্য। কেননা বিধেয় পদ নির্দেশিত সকল শ্রেণীকে অস্বীকার করা হচ্ছে। বচনটির বক্তব্য হল যারা মানুষ তারা অমর নয় অনুরূপভাবে যারা অমর তারা মানুষ শ্রেণীভক্ত নয়।অর্থাৎ, E বচনে উদ্দেশ্য পদ ব্যাপ্য এবং বিধেয় পদও ব্যাপ্য।
‘কোন কোন ধার্মিক ব্যক্তি হয় সুখী‘ – (I) এটি একটি বিশেষ সদর্থক বচন। এই বচনে কোন কোন শব্দের দ্বারা ‘ধার্মিক ব্যক্তি’র আংশিক ব্যাক্তার্থকে স্বীকার করা হয়েছে। সেজন্য ধার্মিক ব্যক্তি এই উদ্দেশ্য পদটি অব্যাপ্য। আবার বিধেয় পদ ‘সুখী’ এর অর্থ হল কোন কোন ধার্মিক ব্যক্তি কে সুখী বলে গ্রহণ করা হচ্ছে। সেজন্য এই পদটির আংশিক ব্যাক্তার্থ স্বীকৃত হয়েছে, তাই এই বিধেয় পদটি ও অব্যাপ্য।সুতরাং I বচনে উদ্দেশ্য পদ অব্যাপ্য এবং বিধেয় পদও অব্যাপ্য।
‘কোন কোন ব্যক্তি নয় সৎ‘ – (O) এটি একটি বিশেষ নঞর্থক বচন। এই বচনে উদ্দেশ্য ‘ব্যক্তি’ শ্রেণীর আংশিক ব্যাক্তার্থকে গ্রহণ করা হয়েছে, তাই এই ‘ব্যক্তি’ পদটি অব্যাপ্য হচ্ছে। আবার বিধেয় ‘সৎ’ পদটি ব্যাপ্য। কেননা সৎ পদটি উদ্দেশ্য এর কোন কোন ব্যক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছে।O বচনে উদ্দেশ্য পদ অব্যাপ্য এবং বিধেয় পদ ব্যাপ্য।
নিরপেক্ষ বচনের পদের ব্যাপ্যতা (Distribution of Terms) সম্পর্কে সংক্ষেপে বলা যায় –
A বচনে উদ্দেশ্য পদ ব্যাপ্য এবং বিধেয় পদ অব্যাপ্য।
E বচনে উভয় পদ ব্যাপ্য।
I বচনে উভয় পদ অব্যাপ্য (কোন পদ ব্যাপ্য নয়)।
O বচনে উদ্দেশ্য পদ অব্যাপ্য এবং বিধেয় পদ ব্যাপ্য।
সুতরাং নিরপেক্ষ বচনে পদের ব্যাপ্যতার (Distribution of Terms) নিয়ম হল – i) সামান্য বচনে কেবল উদ্দেশ্য পদ ব্যাপ্য হবে ii) নঞর্থক বচনে কেবল বিধেয় পদ ব্যাপ্য হবে। সেই হেতু, A এবং E বচন সামান্য হাওয়ায় উদ্দেশ্য পদ ব্যাপ্য হয়েছে। আবার E এবং O বচন নঞর্থক হওয়ায় বিধেয় পদ ব্যাপ্য হয়েছে।
উপসংহার
পরিশেষে পদের ব্যপ্যতা (Distribution of Terms) সম্পর্কে সংক্ষেপে এমন বলা যায়, যদি কোন বচনে কোন পদের সম্পূর্ণ বাচ্যার্থকে স্বীকার বা অস্বীকার করা হয় তবে সেই পদটি ব্যাপ্য হয়। এবং যদি কোন বচনে কোন পদের আংশিক বাচ্যার্থকে স্বীকার বা অস্বীকার করা হয় তখন সেই পদটি অব্যাপ্য হয়।
তথ্যসূত্র (References)
- History of Western Philosophy: B. Russell
- History of Modern Philosophy: R. Falckenberg
- A Critical History of Modern Philosophy: Y.H. Masih
- A History of Philosophy: F. Thilly
- A History of Modern Philosophy: W.K. Wright
- A Critical History of Western Philosophy: D.J. O’Connor
- Internet Sources
প্রশ্ন – পদের ব্যাপ্যতার নিয়ম কয়টি ?
উত্তর – পদের ব্যাপ্যতার নিয়ম হল দুটি।
প্রশ্ন – ব্যাপ্য কাকে বলে ?
উত্তর – নিরপেক্ষ বচনে কোন পদের সমগ্র ব্যক্তার্থকে গ্রহণ করলে সেই নিরপেক্ষ বচনে সেই পদটিকে ব্যাপ্য বলা হয়।
প্রশ্ন – ব্যাপ্য ও অব্যাপ্য পদ কাকে বলে ?
উত্তর – নিরপেক্ষ বচনে কোন পদের সমগ্র ব্যক্তার্থকে গ্রহণ করলে সেই নিরপেক্ষ বচনের সেই পদটিকে ব্যাপ্য বলা হয়।
নিরপেক্ষ বচনে কোন পদের আংশিক ব্যক্তার্থকে গ্রহণ করলে সেই নিরপেক্ষ বচনের সেই পদটিকে অব্যাপ্য বলা হয়।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy