দর্শনের বিষয়বস্তু গুলি বিভিন্ন দিক থেকে নানা ভাবে আলোচিত ও পর্যালোচিত হওয়ায় তা বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়েছে। দর্শনকে জানতে তাই দর্শনের প্রধান শাখা গুলির (Branches of Philosophy) আলোচনা করা প্রয়োজন।
দর্শনের প্রধান শাখা গুলি | Branches of Philosophy
দর্শনের আলোচনার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। সমগ্র বিশ্ব জগৎই দর্শনের আলোচনার বিষয়। আমাদের অভিজ্ঞতার এমন কোন ক্ষেত্র নেই যা দর্শনের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত নয়। এজন্য বলা হয় দর্শনের কোন নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নেই।
দর্শনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যেহেতু সামগ্রিকতার সন্ধান তাই দর্শনের বিভিন্ন শাখা থাকলেও তাদের মধ্যে নিবিড় সম্বন্ধে বর্তমান।
যে শাস্ত্র জগৎ ও জীবের একটি সামগ্রিক যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেয় এবং জাগতিক বিষয়ের সম্পর্কীয় অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করে তাকে দর্শন বলে।
দর্শনের ক্ষেত্র সমগ্র বিশ্ব। দর্শনের বিষয় অন্তহীন। মানুষের জ্ঞান তৃষ্ণা এবং জ্ঞান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দর্শনের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কীয় বিভাগ ও বেড়েই চলেছে। দর্শনের বিভিন্ন শাখার প্রধান শাখা গুলি আলোচনার মধ্য দিয়েই দর্শনের বিষয়বস্তু ও সমস্যা সম্বন্ধে একটি প্রাথমিক ধারণা গড়ে তোলা সম্ভব।
দর্শনের বিভিন্ন শাখা (Branches of Philosophy) আছে। শাখা গুলির মধ্যে মুখ্য বা প্রধান শাখা গুলি হল –
ক) অধিবিদ্যা (Metaphysics)
খ) জ্ঞান-বিদ্যা (Epistemology)
গ) নীতিবিদ্যা (Ethics)
ঘ) যুক্তিবিদ্যা (Logic)
ঙ) মূল্য বিদ্যা (Axiology)
চ) সমাজ দর্শন (Social Philosophy)
ছ) রাষ্ট্র দর্শন (Political Philosophy)
এছাড়া হল –
জ) মনোবিদ্যা (Psychology) ও
ঝ) ধর্ম দর্শন (Theology)
উপরোক্ত দর্শনের মুখ্য শাখা (Branches of Philosophy) গুলির বিস্তারিত নিম্নে উল্লেখ করা হল-
অধিবিদ্যা
দর্শনের যে শাখা (Branches of Philosophy) বস্তুর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপকে অতিক্রম করে অতীন্দ্রিয় রূপকে জানতে চায়, তাকে অধিবিদ্যা বলে। বস্তুর অতীন্দ্রিয়রূপকে বস্তু স্বরূপ বলে। অধিবিদ্যার আলোচ্য বিষয় হল বস্তুর স্বরূপ।
অধিবিদ্যা হল দর্শনের একটি অপরিহার্য অঙ্গ বা শাখা। অধিবিদ্যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Metaphysics, গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল সর্বপ্রথম এই Metaphysics শব্দটি ব্যবহার করেন। ইংরেজি ‘Metaphysics’ শব্দটির অর্থ অনুধাবন করার জন্য আমরা শব্দটিকে দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি। একটি হলো ‘Meta’ এবং অপরটি ‘Physics’। ‘Meta’ কথার অর্থ হলো অতিক্রান্ত(Beyond) এবং ‘Physics’ কথার অর্থ হলো দৃশ্যমান জগৎ(Physical world)। তাই Metaphysics শব্দটির অর্থ হল দৃশ্যমান জগৎ এর অতীত অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াতীত জগৎ।
পদার্থবিদ্যা জাগতিক বস্তু নিয়ে আলোচনা করে, জাগতিক বস্তু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাই অধিবিদ্যা বস্তুর ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য রূপকে অতিক্রম করে বস্তুর অতীন্দ্রীয় রূপকে জানতে চায়।
দৃশ্যমান বহুর আড়ালে যে একের প্রকাশ, সেই এক হল পরমতত্ত্ব। বস্তুর বাহ্যরূপ স্থান, কাল, ভেদে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু বস্তুর স্বরূপ পরিবর্তন হয় না, সেটা অপরিবর্তনীয়। দর্শনের মূল লক্ষ্য হল বস্তুর স্বরূপ ব্যাখ্যা করা। দর্শনের অন্যতম শাখা হিসেবে অধিবিদ্যা এই স্বরূপ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। এক কথায় অতীন্দ্রিয় জগৎ হল অধিবিদ্যার আলোচ্য বিষয়।
জ্ঞান বিদ্যা
জ্ঞানবিদ্যা ইংরেজি Epistemology -র প্রতিশব্দ। Epistemology কথাটি ‘Episteme’ এবং ‘Logia’ এই দুটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে।‘Episteme’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘জ্ঞান’ এবং ‘Logia’ শব্দের অর্থ ‘বিদ্যা’। তাই ব্যুৎপত্তিগত ভাবে এর অর্থ হল জ্ঞান সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান।
দর্শনের যে শাখা (Branches of Philosophy) জ্ঞানের স্বরূপ, জ্ঞানের শর্ত, সম্ভাবনা, জ্ঞানের উৎস ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে তাকে জ্ঞানতত্ত্ব বা জ্ঞানবিদ্যা বলে। দর্শন জগৎ ও জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক জ্ঞান গড়ে তুলতে চায়। জ্ঞানবিদ্যা কথাটি থেকে বোঝা যায় যে জ্ঞান সংক্রান্ত আলোচনা, জ্ঞান কি, জ্ঞানের উৎস কি, জ্ঞানের সীমা কতটুকু, জ্ঞানের সত্য-মিথ্যা যাচাই করার উপায় কি, যথার্থ জ্ঞানের পার্থক্য কি, ইত্যাদি প্রশ্ন জ্ঞান বিদ্যার প্রধান আলোচ্য বিষয়।
যুক্তিবিদ্যা
দর্শনের যে শাখা (Branches of Philosophy) বৈধ চিন্তার নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা করে তাকে যুক্তিবিদ্যা বা যুক্তিবিজ্ঞান বলে। যুক্তিবিদ্যা বৈধ ও যুক্তির নিয়মাবলী প্রণয়ন করে ও ওই নিয়মকে সামনে রেখে আমাদের যুক্তি গঠনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তি বৈধ না অবৈধ তা বিচার করে।
ইংরেজি ‘Logic’ কথাটি গ্রিক শব্দ ‘Logos’ থেকে এসেছে। ‘Logos’ একটি গ্রিক ভাষায় reason (অনুমান বা চিন্তা) ও speech (বাক্ বা ভাষা) এই উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ভাষায় প্রকাশিত চিন্তা সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক আলোচনাই যুক্তিবিদ্যা। যে চিন্তা ভাষায় ব্যক্ত হয়নি তার সম্পর্কে কোন আলোচনা সম্ভব নয়। কিন্তু ভাষায় প্রকাশিত চিন্তা সম্পর্কিত যে কোন আলোচনাই Logic নয়। ভাষায় প্রকাশিত নির্ভুল চিন্তা সম্পর্কিত আলোচনাই Logic। চিন্তা শব্দের দ্বারা যুক্তি বা অনুমানও শুচিত হয়।
নীতিবিদ্যা
নীতিবিদ্যা কথাটি ইংরেজি ‘Ethics’ শব্দটির প্রতিশব্দ। ‘Ethics’ কথাটি এসেছে গ্রিক ‘Ethika’ শব্দ থেকে। আবার ‘Ethika’ শব্দটির উৎস হচ্ছে গ্রীক শব্দ ’Ethos’ থেকে। ’Ethos’ কথাটির অর্থ চরিত্র, রীতি-নীতি, আচার-আচরণ। নীতিবিদ্যা হল মানুষের আচার-আচরণ ও ব্যক্তির চরিত্র সম্পর্কীয় বিদ্যা।
সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তির আচরণ সম্পর্কীয় আদর্শনিষ্ঠ বিজ্ঞান হল নীতিবিদ্যা। নীতিবিদ্যা নৈতিক আদর্শের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির আচরণের মূল্যায়ন করে, নৈতিক আদর্শের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে।
মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের সামাজিক জীবনের সঙ্গে নৈতিকতা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। মানুষ তার নৈতিক কর্ম সম্পাদন করে থাকে এই সমাজ জীবনেই। সুতরাং নৈতিকতা হল মানুষের আচরণগত একটি ধর্ম নৈতিক কর্ম বলতে দয়া, মায়া, দাক্ষিণ্য, সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, ইত্যাদি বোঝায়। যে শাস্ত্রে নৈতিকতা সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা করা হয়ে থাকে তার নাম নীতিবিদ্যা।
দৈনন্দিন জীবনে আমরা বিভিন্ন কাজের মূল্যায়ন করি। বলি এই কাজটি ভালো, ওই কাজটি খারাপ, বলে থাকি চুরি করা খারাপ, অপরের অনিষ্ট করা ভালো নয়, সকলের ভালো করা উচিত ইত্যাদি। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত, প্রভৃতি পদগুলো ব্যবহার করে আমরা কাজের নৈতিকতা বিচার করি। এইসব নৈতিকতা বোধক প্রত্যয়ের অর্থ বিশ্লেষণ করা, তাদের অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করা ও তাদের পরস্পর সম্পর্ক নির্ধারণ করা এসব হলো নীতিবিদ্যার কাজ।
সমাজ দর্শন
দর্শনের যে শাখা (Branches of Philosophy) সমাজের উৎপত্তি, বিকাশ, রীতিনীতি, সামাজিক পরিবর্তন ও বিবর্তন সম্পর্কে দর্শন সম্মত আলোচনা করে তাকে সমাজ দর্শন বলে। সামাজিক ঘটনার দার্শনিক মূল্যায়ন করা সমাজ দর্শনের কাজ।
সমাজ দর্শন শব্দটির উদ্ভব হয়েছে সমাজ ও দর্শন এই দুটি শব্দের সমাহারে। দর্শনের কাজ হল মানব অভিজ্ঞতার অর্থ তাৎপর্য ও মূল্য নির্ধারণ করা। আর সমাজ হল সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ে সচেতন জনগোষ্ঠী। সুতরাং আক্ষরিক দিক থেকে বিচার করলে আদর্শ ও মূল্যায়নের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সামাজিক ঘটনা সমূহের বিচার-বিশ্লেষণই হলো সমাজ দর্শন।
রাষ্ট্র দর্শন
দর্শনের যে শাখা (Branches of Philosophy) বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারণার যেমন- গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, অধিকার, কর্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দান করে এবং আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের যুক্তিসম্মত মূল্যায়ন করে তাকে রাষ্ট্রদর্শন বলে। রাজনৈতিক বিষয় সম্বন্ধে দার্শনিক সিদ্ধান্ত হল রাষ্ট্রদর্শন। রাষ্ট্রের ধ্যান-ধারণা নিয়ে যে দর্শন সম্বন্ধীয় আলোচনা তাই হলো রাষ্ট্রদর্শন।
প্রচলিত মতে রাষ্ট্রদর্শন এক আদর্শনিষ্ঠ আলোচনা। কারণ রাষ্ট্রদর্শনে কোন একটি মানদন্ড বা আদর্শের ভিত্তিতে মানুষের রাজনৈতিক জীবনের তথা রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল্যায়ন করা হয়।
মনোবিদ্যা
মনোবিদ্যাও দর্শনের একটি অন্যতম শাখা (Branches of Philosophy)। এই মনোবিদ্যার সাহায্যে মানসিক জগতের সমস্ত ক্রিয়াগুলিকে জানা দিতে হয় আবেগ কামনা বাসনা স্বপ্ন ইত্যাদি মানসিক ব্যক্তিগুলোকে মনোবিজ্ঞানে অন্তর্ভুক্ত করে মানুষকে সচেতন করা হয়।
ধর্ম দর্শন
দর্শনের আরো একটি শাখা (Branches of Philosophy) হল ধর্ম দর্শন। ধর্ম দর্শনের সাহায্যে মানুষের ধর্মীয় আচরণ বিধি মেনে চলা নির্দেশ দেওয়া হয়, আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের মানুষ বসবাস করে এবং তারা কোন না কোন ধর্মের আশ্রয় বেঁচে থাকে ধর্ম ব্যাপারে প্রত্যেকের কাছে প্রত্যেকের ধর্ম সেরা বলে বিবেচিত হয়।
সুতরাং রাষ্ট্রদর্শনে রাষ্ট্রের প্রচলিত বিশ্বাসের মূল্যায়ন এবং সেই প্রসঙ্গে তাদের অর্থবিশ্লেষণ করা হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দর্শনকে জানতে কেবল তার কয়েকটি মুখ্য শাখা বা প্রধান শাখাকে (Branches of Philosophy) জানাই যথেষ্ট নয়। দর্শন শব্দটির বা দর্শন বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান হতে গেলে তার সমস্ত শাখা গুলোকে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা আবশ্যক। দর্শনের প্রত্যেকটি শাখা কে জানলে তবেই দর্শনকে পূর্ণাঙ্গ রূপে জানা সম্ভব হবে।
তথ্যসূত্র (References)
- History of Western Philosophy: B. Russell
- History of Modern Philosophy: R. Falckenberg
- A History of Philosophy: F. Thilly
- A History of Modern Philosophy: W.K. Wright
- Internet Sources
প্রশ্ন – ভারতীয় দর্শন কত প্রকার?
উত্তর – ভারতীয় দর্শন মূলত ৯টি ভাগে বিভক্ত। চার্বাক দর্শন, বৌদ্ধ দর্শন, জৈন দর্শন, ন্যায় দর্শন, বৈশেষিক দর্শন, মীমাংসা দর্শন, সাংখ্য দর্শন, যোগদর্শন ও বেদান্ত দর্শন।
প্রশ্ন – দর্শনের শাখা কয়টি ও কি কি?
উত্তর – দর্শনকে মূলত দু’রকমভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, ভারতীয় দর্শন ও পাশ্চাত্য দর্শন। ভারতীয় দর্শনকে আবার বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায় যেমন – চার্বাক দর্শন, বৌদ্ধ দর্শন, জৈন দর্শন, ন্যায় দর্শন, বৈশেষিক দর্শন, মীমাংসা দর্শন, সাংখ্য দর্শন, যোগদর্শন ও বেদান্ত দর্শন।
পাশ্চাত্য দর্শন যেমন –
অধিবিদ্যা (Metaphysics), জ্ঞান-বিদ্যা (Epistemology), নীতিবিদ্যা (Ethics), যুক্তিবিদ্যা (Logic), মূল্য বিদ্যা (Axiology), সমাজ দর্শন (Social Philosophy), রাষ্ট্র দর্শন (Political Philosophy)
এছাড়া হল – মনোবিদ্যা (Psychology) ও ধর্ম দর্শন (Theology) ইত্যাদি।
প্রশ্ন – ষড়দর্শন কি কি?
উত্তর – সাংখ্যদর্শন, যোগদর্শন, ন্যায়দর্শন, বৈশেষিকদর্শন, মীমাংসাদর্শন ও বেদান্তদর্শন এই কটি দর্শনকে একত্রে ষড়দর্শন বলা হয়।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy