দেহ ও মন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির হওয়া সত্ত্বেও তারা পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কে আবদ্ধ,দেকার্তের এই মতবাদ ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ (Mind Body Interactionism) হিসেবে পরিচিত।
দেহ ও মন সম্পর্কে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ |Mind Body Interactionism
দেকার্তের মতে চেতনার আশ্রয় হল মন, যা জড় দেহ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। জড় বা দেহ এবং মন দুটি স্বনির্ভর স্বতন্ত্র দ্রব্য।
দেহ তার অস্তিত্বের জন্য মনের উপর নির্ভর করে না এবং মনও তার অস্তিত্বের জন্য দেহের উপর নির্ভর করে না।
দেহের ধর্ম মনে থাকে না এবং মনের ধর্মও দেহে থাকে না। দেহের আবশ্যিক ধর্ম হল বিস্তার এবং মনের আবশ্যিক ধর্ম হল চিন্তন। মনের বিস্তার নেই কিন্তু দেহের চেতনাও নেই। ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তের এই ধরনের মতবাদ দর্শনের ইতিহাসে দ্বৈতবাদী মতবাদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
দেহ ও মনের মধ্যে এক বিশেষ সম্পর্ককে উপলব্ধি করে দেকার্ত বলেন দেহ ও মন যে সম্পর্কে আবদ্ধ তা হল কার্যকারণ সম্পর্ক। এই সম্পর্ক হল পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক। এই প্রকার অভিমতকে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ ও বলা হয়।
ব্যবহারিক জীবনে আমরা দেখি কখনও মন দেহকে আবার কখনও দেহ মনকে প্রভাবিত করে। মন খারাপ থাকলে অর্থাৎ মন যদি ভালো না থাকে তাহলে দৈহিক শক্তি হ্রাস পায়। মন যদি আনন্দিত থাকে তাহলে দৈহিক শক্তি সেক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায়, এখানে মন দেহকে প্রভাবিত করে। তেমনি আবার দেহ অসুস্থ হলে চিন্তন সামর্থ্য কমে যায়। এখানে দেহ মনকে প্রভাবিত করে। এসবের ব্যাখ্যা দিতে হলে তাই মন ও দেহের মধ্যে এক প্রকার যে পারস্পরিক কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে তা স্বীকার করতেই হয়।
দেকার্ত এর মতে চেতনা কেবল মানুষের দেহেই অবস্থান করে। মানুষ দেহ ও মনের যুগ্মসত্ত্বা হলেও দেকার্ত মনে করেন যে, মানুষের দেহের সঙ্গে মনের কোন মিলন বা মিল থাকতে পারে না। মন কেবল স্বতন্ত্র দ্রব্য রূপে দেহে অবস্থান করে। এই অবস্থান রূপ সম্বন্ধের জন্য মানুষ তার ইচ্ছেমতো দেহের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এজন্য দেকার্ত মনে করেন যে, মনের সঙ্গে দেহের সম্পর্ক হল ঠিক চালকের সঙ্গে চালিতের সম্পর্কের মতন। মনের কোন যন্ত্রনা হলে দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার দেহে ক্ষত হলে মনে ব্যথা অনুভব হয়। কাজেই মানতেই হয় যে মানুষের ক্ষেত্রে দেহ ও মনের পারস্পরিক সম্পর্ক বর্তমান রয়েছে।
ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ প্রসঙ্গে দেকার্তের ব্যাখ্যা
ফরাসী দার্শনিক রেনে দেকার্ত তার দ্বৈতবাদ অনুসারে দেহ ও মনকে কিভাবে পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া যুক্ত তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন –
দেকার্ত বলেন দেহ ও মন পরস্পর দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তাদের মধ্যে একপ্রকার সম্পর্ক বর্তমান। তবে দেহ ও মনের এই সম্পর্ক সমগ্র নয় তা হলো আংশিক। যেমন মনের সঙ্গে দেহের সম্পর্ক বিশেষ করে দেহের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশের সঙ্গে মস্তিষ্কের অন্তর্গত পিনিয়াল গ্রন্থির এক প্রকার সম্পর্ক।
দেহ ও মনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার (Mind Body Interactionism) মূলে হল মস্তিষ্কের অন্তর্গত অতিক্ষুদ্র পিনিয়াল গ্রন্থি। দৈহিক পরিবর্তন সরাসরি পিনিয়াল গ্রন্থিকে প্রভাবিত করে এবং এর ফলে সেই উত্তেজনা মানসিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। আবার তেমনই মানসিক চিন্তা পিনিয়াল গ্রন্থিকে প্রভাবিত করলে সেই উত্তেজনা দৈহিক পরিবর্তনের কারণ হয়। এই পিনিয়াল গ্রন্থির মাধ্যমে মন দেহকে এবং দেহ মনকে প্রভাবিত করে থাকে। দেকার্ত বলেন এর থেকে আমরা বলতে পারি যে দেহ মনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বর্তমান।
দেকার্ত আরো বলেন যে দেহ মনের সম্পর্ককে ‘সহাবস্থানের সম্পর্ক’ও বলা যায়। দেহ ও মনের এই সম্পর্ককে তিনি ‘সাংগঠনিক ঐক্য’ বলেছেন। তবে দেহ ও মনের এই সম্পর্ককে স্বভাবগতভাবে মিলনের সম্পর্ক বলেননি। তিনি বলেন ঈশ্বর মানুষের মধ্যে দেহ ও মন সন্নিবিষ্ট করলেও তাদের প্রকৃতিগত ভাবে অভিন্ন অর্থাৎ তাদের অভিন্নতা অক্ষুন্ন রেখেছেন।
দেহ ও মনের সম্বন্ধ সম্পর্কিত দেকার্তের এই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদকে (Mind Body Interactionism) সমস্ত দার্শনিক মেনে নেননি। বিভিন্নভাবে তা সমালোচিত হয়েছে –
- আধুনিক বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের প্রমাণিত হয়েছে যে জড় বলে কিছু নেই, জড় কণাকে বিশ্লেষণ করলে অন্তিম পর্যায়ে পাওয়া যায় শক্তি কণা – ইলেকট্রন ও প্রোটন। শক্তি জগতের মূল হলে দেকার্তের এই দ্বৈতবাদ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, কেননা জড় বলে তখন আর কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
- দেকার্ত যে সাংগঠনিক ঐক্যের উল্লেখ করেছেন সেই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। দুটি ভিন্ন বস্তুর মধ্যে যদি কখনো সাংগঠনিক ঐক্য দেখা যায় তাহলে তাদের প্রত্যেকের স্বভাবের কিছুটা পরিবর্তন হয়। দুটি বস্তুর নিজের নিজের স্বভাব অব্যাহত থাকলে তাদের মধ্যে সাংগঠনিক ঐক্য থাকতে পারে একথা কখনোই বলা যাবে না।
- জড় জগৎ ও চেতন জগতের শক্তির পরিমাণ স্থির থাকে বাড়েনা বা কমেও না, কেবল জড়শক্তির এবং মানসিক শক্তির রূপান্তর ঘটতে পারে শক্তির নিত্যতা নিয়ম অনুসারে এমনটাই স্বীকার করতে হয়। কিন্তু ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ মানলে বলতে হয় জড়শক্তি যখন মনকে প্রভাবিত করে তখন জড়শক্তি কমে যায় এবং চেতন শক্তি যখন দেহকে প্রভাবিত করে তখন চেতন শক্তিও কমে যায়। এমন অভিমত শক্তির নিত্যতা নিয়মের বিরোধী হয়ে যায়।
- দুটি বিরুদ্ধে ধর্মী অর্থাৎ দেহ মনের মধ্যে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ প্রকৃতি বিজ্ঞানের কারণতার নিয়ম অনুসারে সম্ভব হতে পারে না। নিয়ম হল কার্য ও কারণ এর মধ্যে গুণগত সাদৃশ্য ও পরিমাণগত সমতা থাকতে হবে অর্থাৎ দেহ ও মনের মধ্যে কার্যকরণ সম্ভব হবে তখনই যদি তাদের মধ্যে গুণগত অথবা পরিমাণগত সাদৃশ্য থাকে। কিন্তু দেহ ও মন দুটি বিজাতীয় হওয়ায় এদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক সম্ভব একথা স্বীকার করা যাবে না।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যেহেতু দেকার্তের দেহ ও মন সম্পর্কে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ (Mind Body Interactionism) সমালোচনার যোগ্য তাই এই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ কখনো সন্তোষজন মতবাদ হতে পারে না।দেকার্তের অভিমতের বিপক্ষে যুক্তি উল্লেখ করে এমন সিদ্ধান্ত করতে হয় যে দেহ ও মনকে দুটি ভিন্নধর্মী দ্রব্য হিসেবে গণ্য করে এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া স্বীকার করে দেকার্ত দর্শনের জগতে এমন এক সমস্যা সৃষ্টি করেছেন যার সহজ সমাধান আজও সম্ভব হয়নি। তার মতবাদ পরবর্তী আলোচনাকে আরো দীর্ঘায়িত করেছে একথা বলাই যায়।
তথ্যসূত্র (References)
- An Introduction to Philosophical Analysis : J. Hospers
- An Introduction to Philosophy : Shibapada Chakraborty
- The Fundamental Questions of Philosophy: A. C Ewing
- The Fundamentals of Philosophy: D. L. Das
- Problems of Philosophy: G Watts Cunnigham
- A History of Modern Philosophy: W. K. Wright
- Internet Sources
প্রশ্ন – দেহ ও মন সম্পর্কে দ্বৈতবাদ কে উত্থাপন করেন?
উত্তর – ফরাসী বুদ্ধিবাদী দার্শনিক রেনে দেকার্ত দেহ ও মনকে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন ও স্বতন্ত্র দ্রব্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। দেহ ও মন সম্পর্কে তিনি দ্বৈতবাদী মত পোষণ করেন।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy