মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতি ব্যাখ্যা করো | Mill’s Method of Difference

মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতি (Mill’s Method of Difference) তার পাঁচ প্রকার পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি।

পাঁচ প্রকার আরোহ পদ্ধতি বা পরীক্ষা পদ্ধতির কথা তর্কবিদ মিল উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল -১) অন্বয়ী পদ্ধতি ২) ব্যতিরেকী পদ্ধতি ৩) অন্বয়ী ব্যতিরেকী পদ্ধতি ৪) সহ পরিবর্তন পদ্ধতি ৫) পরিশেষ পদ্ধতি

মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতি | Mill’s Method of Difference

আলোচ্য ঘটনাটি যে দৃষ্টান্তে উপস্থিত আছে এবং আলোচ্য ঘটনাটি যে দৃষ্টান্তে উপস্থিত নেই এরূপ দৃষ্টান্ত দুটির মধ্যে যদি একটি মাত্র ঘটনা ছাড়া সব ব্যাপারে মিল থাকে তবে যে ঘটনাটির জন্য দৃষ্টান্ত দুটির মিল থাকেনা অর্থাৎ অমিল, সেটি হবে আলোচ্য ঘটনার কারণ বা কার্য বা কারণের অপরিহার্য অংশ।

পদ্ধতিটির ব্যাখ্যা

‘ব্যতিরেক’ কথার অর্থ হল অভাব বা অমিল। এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি হল দুটি দৃষ্টান্তের অমিল বা দুটি দৃষ্টান্তের একটি ঘটনার অভাব বা অনুপস্থিতি। এ কারণেই এই পদ্ধতিকে ব্যতিরেকী পদ্ধতি বলা হয়ে থাকে।

অপসারণের দ্বিতীয় সূত্র টির ওপর ব্যতিরেকী পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত। অপসারণের দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে যদি A ঘটলে B না ঘটে তবে A কে B এর কারণ বলা যাবে না এবং B কে A এর কার্য বলা যাবে না।

ব্যতিরেকী পদ্ধতির সূত্রে এই কথাগুলো একটু ভিন্নভাবে বলা হয়েছে – যদি এমন হয় যে কোন ঘটনা উপস্থিত না হলে অন্য একটি ঘটনা উপস্থিত হয় না এবং প্রথম ঘটনাটি উপস্থিত হলেই অন্য ঘটনাটিও উপস্থিত হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে ওই দুটি ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে।

যেহেতু ব্যতিরেকী পদ্ধতি প্রয়োগ করার জন্য প্রকৃতিতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি থাকে না। যেমন একটি ঘটনা আছে এবং সেই ঘটনাটি নেই এমন ভাবে ঠিক দুখানা সাজানো দৃষ্টান্ত প্রকৃতিতে পর্যবেক্ষণ করে আমরা কখনোই পাইনা।

এরূপ পরিবেশকে কৃত্রিমভাবে নিজেদের তৈরি করে নিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করতে হয়।। অর্থাৎ দুটো ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করার এরূপ পদ্ধতিকে পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি বলা হয়।

সদর্থক ও নঞর্থক দুটি দৃষ্টান্ত কেবল প্রয়োজন হয় ব্যতিরেকী পদ্ধতির সূত্রটিকে বিশ্লেষণ করতে।পরীক্ষণ এর সাহায্যে যে দুই রকম দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করা হয় তার মধ্যে একটি মাত্র ঘটনার পার্থক্য থাকে এবং অন্যান্য ঘটনাগুলির মধ্যে মিল থাকে।

প্রথম দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে একটি ঘটনা উপস্থিত বা অনুপস্থিত থাকলে আলোচ্য ঘটনাটিও উপস্থিত বা অনুপস্থিত থাকে। আবার অনুরূপভাবে দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে একটি মাত্র ঘটনা অনুপস্থিত বা উপস্থিত থাকলে আলোচ্য ঘটনা উপস্থিত বা অনুপস্থিত থাকে।

এর থেকে সিদ্ধান্ত করা যায় যে, দুটি দৃষ্টান্তের মধ্যে যে ঘটনাটি কেন্দ্র করে পার্থক্য থাকে সেটি হল আলোচ্য ঘটনার কার্য বা কারণ বা কারণের অংশ। এপ্রকার পদ্ধতিকে ব্যতিরেকী পদ্ধতি বলা হয়।

সাংকেতিক আকার

মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতির (Mill’s Method of Difference) সাংকেতিক উদাহরণ নিম্নরূপ –

পূর্বগামী ঘটনাঅনুগামী ঘটনা
A B C a b c
__Bc__bc
.’. A হল a এর কারণ এবং a হল A এর কার্য।
পূর্বগামী ঘটনা অনুগামী ঘটনা
__Bc__bc
A B Ca b c
সুতরাং A হল a এর কারণ এবং a হল A এর কার্য।

বাস্তব উদাহরণ

মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতির ( Mill’s Method of Difference ) বাস্তব উদাহরণ নিম্নরূপ –

যুক্তিঃ- অক্সিজেনের উপস্থিতিতে একটি জ্বলন্ত উনুনে জ্বালানি কাঠ দেওয়া হল। উনুনটি জ্বলতে লাগলো। এখন ঊনুনটিকে অক্সিজেন পৌঁছবে না এমন একটি বদ্ধ ঘরে জ্বালানো হলো। কিন্তু উনুনটি আর জ্বলল না। তা নিভে গেল। অর্থাৎ অক্সিজেন উপস্থিত থাকাই হলো উনুনে আগুন জ্বলার কারণ।

পূর্বগামী ঘটনাঅনুগামী ঘটনা
জ্বলন্ত উনুন এবং জ্বালানি কাঠ এবং অক্সিজেনউনুনে আগুন জ্বলতে লাগলো
জ্বলন্ত উনুন এবং জ্বালানি কাঠউনুনের আগুন নিভে গেল
.’. অক্সিজেন থাকাই হল উনুনে আগুন জ্বলার কারণ, যেখানে উনুনে আগুন জ্বলা হল অক্সিজেন থাকার কার্য।

যুক্তিঃ- বিদ্যুৎ সংযোগ নেই এমন একটি বৈদ্যুতিক বাল্বকে জ্বালানোর চেষ্টা করা হলো। কিন্তু বৈদ্যুতিক বাল্বটি কোন আলো বিচ্ছুরিত করল না বা জ্বলল না। এখন বৈদ্যুতিক বাল্বটিকে বিদ্যুৎ সংযোগ করা হলো। সাথে সাথে বৈদ্যুতিক বাল্বটিতে আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগলো বা জ্বলে উঠলো। সুতরাং বিদ্যুৎ সংযোগ হল বৈদ্যুতিক বাল্বের জ্বলে ওঠার কারণ।

পূর্বগামী ঘটনাঅনুগামী ঘটনা
ইলেকট্রিক বাল্ব এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নবাল্বটিতে আলো জ্বলল না
ইলেকট্রিক বাল্ব এবং বিদ্যুৎ সংযোগবাল্বটিতে আলো জ্বলল
সুতরাং বিদ্যুৎ হল বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বলার কারণ এবং বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বলা হল বিদ্যুৎ থাকার কার্য।

ব্যতিরেকী পদ্ধতির সুবিধা

মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতির ( Mill’s Method of Difference ) সুবিধা গুলি হল –

১) ব্যতিরেকী পদ্ধতি হল পরীক্ষামূলক পদ্ধতি। সুতরাং এর সাহায্যে নিশ্চিতভাবে কার্যকারণ সম্বন্ধ প্রমাণ করা যায়।

২) মিলের এই ব্যতিরেকী পদ্ধতির সাহায্যে কার্য থেকে কারণ এবং কারণ থেকে কার্যে উভয়ই অনুমান করা যায়। তাই এই পদ্ধতির প্রয়োগ ক্ষেত্র অনেক বেশি ব্যাপক হয়ে থাকে।

৩) অন্বয়ী পদ্ধতি বা অন্যান্য সকল পদ্ধতিগুলির সাহায্যে যে সিদ্ধান্ত আমরা লাভ করি তার সত্যতা প্রমাণ ব্যতিরেকী পদ্ধতির সাহায্যে নির্ণয় করা যায়।

৪) এই পদ্ধতির প্রয়োগ ক্ষেত্র খুবই সহজ ও সরল হয়ে থাকে। কেননা এই পদ্ধতি প্রয়োগ করার জন্য কেবল সদর্থক এবং নঞর্থক এই দুই প্রকার দৃষ্টান্তের প্রয়োজন হয়।

৫) মিলের এই প্রকার ব্যতিরেকী পদ্ধতি থেকে পাওয়া সিদ্ধান্ত অন্বয়ী পদ্ধতি থেকে পাওয়া সিদ্ধান্ত অপেক্ষা বেশি নিশ্চিত হয়ে থাকে।

৬) চিকিৎসা বিজ্ঞান, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ইত্যাদির ক্ষেত্রে যে কোন তথ্য প্রমানের জন্য ব্যতিরেকী পদ্ধতি খুবই কার্যকরী একটি পদ্ধতি এবং এই পদ্ধতি যেকোনো তথ্য প্রমানে সহায়তা করে।

৭) দৈনন্দিন জীবনে এই পদ্ধতিকে সতর্কভাবে প্রয়োগ করতে পারলে আমরা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত পেতে পারি। তাই মিল বলেন, ব্যতিরেকী পদ্ধতি হল প্রমাণ পদ্ধতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি

ব্যতিরেকী পদ্ধতির অসুবিধা

মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতির ( Mill’s Method of Difference ) অসুবিধা গুলি হল –

১) মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতি প্রধানত পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি হলেও পর্যবেক্ষণের সাহায্যেও ব্যতিরেকী পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। ব্যতিরেকী পদ্ধতিতে যখন পরীক্ষণের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তখন তা সুনিশ্চিত হয়। কিন্তু যখন পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তখন তা অনেক সময় ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে।

২) এই পদ্ধতিতে কারণ থেকে কার্যে যাওয়া যায়, কিন্তু কার্য থেকে কারণে সরাসরি আসা যায় না। কার্য থেকে কারণে আসতে গেলে ব্যতিরেকী পদ্ধতি প্রয়োগের আগে পর্যবেক্ষণমূলক অন্যান্য পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রকল্প গঠন করার প্রয়োজন হয়।

৩) অপসারণের সূত্রের সাহায্যে এখানে অ-কারণকে নিশ্চিতভাবে অপসারণ করা গেলেও কার্যকে নিশ্চিতভাবে অপসারণ করা যায় না। ব্যতিরেকী পদ্ধতি যা কারণ নয়, তাকে অপসারণ করতে পারলেও যা কার্য নয় তাকে সম্পূর্ণ অপসারণ করতে ব্যর্থ হয়।

৪) এই ব্যতিরেকী পদ্ধতির সাহায্যে কার্যকারণ সম্পর্ক সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না।

৫) মিলের এই ব্যতিরেকী পদ্ধতির অসতর্কভাবে প্রয়োগ করলে কাকতালীয় দোষ দেখা যায়।

৬) ব্যতিরেকী পদ্ধতি বহুকারণজনিত দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে কারণ থেকে কার্যকে অনুমান করা যায়। কিন্তু কার্য থেকে কারণের অনুমান সুনিশ্চিত ভাবে করা যায় না।

আরোও পড়ুন – Click here

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায় মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতি (Mill’s Method of Difference) হল এমন এক প্রকার পদ্ধতি যা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। অন্বয়ী পদ্ধতি অপেক্ষা এই পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা জনক বলে গণ্য হয়।

তথ্যসূত্র (References)

  • A system of logic: John Stuart Mill
  •  History of Modern Philosophy: R. Falckenberg
  •  A Critical History of Modern Philosophy: Y.H. Masih
  •  A History of Philosophy: F. Thilly
  •  A Brief History of Western Philosophy: A. Kenny
  • Internet Sources

প্রশ্ন – মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতিকে কেন প্রমাণের পদ্ধতি বলা হয়?

উত্তর – মিলের ব্যতিরেকী পদ্ধতি মূলত পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে দুটি ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ প্রমাণ করা যায়। তাই এই পদ্ধতি হল প্রমাণের পদ্ধতি।

প্রশ্ন – অন্বয়ী পদ্ধতি কোন সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত?

উত্তর – অন্বয়ী পদ্ধতি অপসারণের প্রথম সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রশ্ন – ব্যতিরেকী পদ্ধতি অপসারণের কোন সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত?

উত্তর – পদ্ধতিটি অপসারণের দ্বিতীয় সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সূত্র অনুসারে যদি A ঘটলে B না ঘটে তবে A কে B এর কারণ বলা যাবে না এবং B কে A এর কার্য বলা যাবে না।

Leave a Comment