কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace

ইমানুয়েল কান্ট নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে একপ্রকার সু সম্পর্ককে (Kant’s Relationship Between Morality and Peace) চিহ্নিত করেছেন।নৈতিকতা ও শান্তি উভয়কে একে অন্যের পরিপূরক এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কাম্য বলে তিনি মনে করেন।

কান্টের নৈতিকতা ও শান্তি | Kant’s Morality and Peace

নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে একপ্রকার গভীর সম্পর্ক বর্তমান, ইমানুয়েল কান্ট তা গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তিনি নৈতিকতাকে মানুষের কর্তব্য বলে মনে করতেন। তিনি মনে করতেন এই নৈতিকতার মাধ্যমেই শান্তি স্থাপন সম্ভব। তিনি এমনটা বিশ্বাস করতেন যে একটা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে প্রজাতান্ত্রিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটি শান্তিপূর্ণ সংঘের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়া খুবই আবশ্যক।

ইমানুয়েল কান্ট এর নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে গভীর সম্পর্ককে (Kant’s Relationship Between Morality and Peace) বিভিন্ন রকম ভাবে আলোচনা করা যায় –

নৈতিকতা ও শান্তি

ইমানুয়েল কান্ট এই শান্তি ও নৈতিকতাকে একটি বিশেষভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন নৈতিকতাই হল শান্তির ভিত্তি।আমাদের কাম্য শান্তি যা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এই নৈতিকতার মাধ্যমে। মানুষ তার নৈতিক কাজকর্মের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। নৈতিকতা দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক শান্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

কর্তব্য ও নৈতিকতা

কান্ট এর মত অনুসারে নৈতিকতা হল কর্তব্যের উপর প্রতিষ্ঠিত মানুষের কর্মের ভিত্তি। তিনি মনে করতেন নৈতিকতা মানুষের ইচ্ছা অনুসারে হওয়া উচিত নয়, নৈতিকতা হওয়া উচিত মানুষের যুক্তির উপর নির্ভরশীল। নৈতিকতা ও কর্তব্য একটা সুস্থ, শান্তিপূর্ণ সমাজ এবং সমষ্টিকে গড়ে তুলতে পারে। যে কর্তব্য ও নৈতিকতা প্রতিটি মানুষ এর মধ্যে উপস্থিত থাকা সমাজের ও রাষ্ট্রের জন্য কাম্য।

জাতিগত অধিকার

সমস্ত জাতির একরকম নিজস্ব স্বাধীনতা এবং তাদের সমান অধিকার থাকা জরুরি বলে ইমানুয়েল কান্ট মনে করতেন। তিনি আরও বলেন, কোন জাতি যেন অন্য জাতির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। বরং একটি জাতি অন্য জাতিকে সুরক্ষিত করবে। উভয় জাতির মধ্যে সম্প্রীতি বজায় থাকবে। কখনো যেন মতবিয়োধ এবং ভিন্ন চিন্তা ও মতামত থেকে দন্ধের সৃষ্টি না হয়। কারণ উভয় জাতির সমানাধিকার শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান বলা যেতে পারে।

স্থায়ী শান্তি

স্থায়ী শান্তি সম্পর্কে কান্ট বলেছেন যে রাষ্ট্রগুলি অভ্যন্তরীণভাবে প্রজাতান্ত্রিক হলে এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটি শান্তিপূর্ণ সংঘের মাধ্যমে নিজেদের একত্রিত করলে তবেই শান্তি গড়ে তোলা সম্ভব। তাই শান্তি গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রকে সবার আগে অভ্যন্তরীণভাবে প্রজাতন্ত্রী হতে হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে শান্তিপূর্ণতা বজায় রাখার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রগতি হতে হবে।

মানবাধিকার

ইমানুয়েল কান্ট এর মতে শান্তির জন্য জরুরি হল মানুষের মৌলিক অধিকারকে অখুন্ন রাখা ও তার রক্ষা করা। প্রত্যেকটি মানুষের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং তার আত্ম নিয়ন্ত্রণকে রক্ষা করার জন্য শান্তিপূর্ণ সমাজের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করতেন। কারণ যদি মানুষের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়, যদি তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং তার আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যদি বাধার সৃষ্টি হয়, তাহলে মানুষ কখনো শান্তি কে স্থিতিশীল করতে চায় না। সে নিশ্চিত অশান্ত হয়ে উঠবে এবং তার সামাজ ও পরিবেশকে অশান্ত করবে। তাই তার মতে মানবাধিকার কে প্রাধান্য দেওয়া জরুরী।

প্রজাতন্ত্র

ইমানুয়েল কান্ট প্রজাতন্ত্র বলতে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে রাষ্ট্র ব্যবস্থা জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকারকে রক্ষা করবে। জনগণকে শান্তি ও নিশ্চিন্ত থাকার ব্যবস্থাকে সুনিশ্চিত করবে। যা অশান্তি ও যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তির পথকে অগ্রগতি ঘটাবে।

জাতিগত সংঘ

কান্টের মত অনুযায়ী বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে মতবিরোধ তা এই জাতিগত সংঘের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান ঘটানো সম্ভব হতে পারে।যা যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তির ও সহযোগিতার পথকে প্রশস্ত করতে পারবে। এই জাতিসংঘ বা জাতিগত সংঘ শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।

কান্ট “চিরস্থায়ী শান্তি” বইটিতে তার যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন যে শান্তি সম্ভবপর হতে গেলে রাষ্ট্রগুলিকে প্রজাতন্ত্রী নীতি অনুসারে অভ্যন্তরীণভাবে প্রজাতান্ত্রিক হতে হবে। রাষ্ট্রগুলিকে আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাথে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং কেবল নিজের দেশ নয় অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মানবাধিকারকে সম্মান জানাতে হবে। তবেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

আরোও পড়ুন – Click here

উপসংহার

কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক (Kant’s Relationship Between Morality and Peace) সম্পর্কে শেষে বলা যায়, শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নৈতিকতা,জাতিগত অধিকার,প্রজাতন্ত্র,মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রের দৃষ্টিগোচর হওয়া এবং সেগুলোর সুনিশ্চিত করন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যেগুলি শান্তি প্রতিষ্ঠায় আবশ্যিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তথ্যসূত্র (References)

  • Conflict Resolution and Gandhian Ethics –Thomas Weber, Gandhi Peace Foundation, New Delhi, 1991.
  • Peace Education: The Concept, Principles and Practices around the World – (eds.) Gabriel Solomon and Baruch Nevo, .
  • Comprehensive Peace Education—Betty Reardon, Teachers College Press, 1988.
  • Philosophical Perspectives of Peace – Howard P. Kainz
  • Peace, War and Defence – (ed.) Johan Galtung
  • Internet Sources

প্রশ্ন – “চিরস্থায়ী শান্তি” বইটি কার লেখা?

উত্তর – “চিরস্থায়ী শান্তি” এই বিখ্যাত বইটি প্রখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের লেখা।যা প্রকাশিত হয়েছিল 1795 সালে। 

Leave a Comment