যুক্তিবিদ্যার বিশেষ একটি অংশ হল বচন। এই বচনগুলি যেমন জানা প্রয়োজন। তার সাথে সাথে বচনের বিরোধিতা এবং বচনের বিরোধিতার প্রকারভেদ (Type of Square of Opposition) সম্পর্কে ও জানা প্রয়োজন।
একই উদ্দেশ্য এবং বিধেয় সম্বন্ধিত দুটি নিরপেক্ষ বচনের মধ্যে যদি গুনের পার্থক্য থাকে অথবা পরিমানের পার্থক্য থাকে অথবা গুণ ও পরিমান উভয়ের পার্থক্য থাকে, তাহলে বচন দুটির একটিকে অপরটির বিরোধী বচন বলে এবং তাদের মধ্যে যে সম্বন্ধ পরিলক্ষিত হয় তাকে বচনের বিরোধিতা বলে।
বচনের বিরোধিতার প্রকারভেদ | Type of Square of Opposition
বচনের বিরোধিতার ক্ষেত্রে দুটি বচনের মধ্যে কখনো বা গুণের, কখনো বা পরিমানের, কখনো আবার গুণ ও পরিমাণ উভয়ের পার্থক্যের ভিত্তিতে বচনের বিরোধিতাকে চার ভাগে বিভক্ত করা যায় –
১. বিপরীত বিরোধিতা (Contrary Opposition) (A – E)
২. অধীন বিপরীত বিরোধিতা (Sub-Contrary Opposition) (I – O)
৩. বিরুদ্ধ বিরোধিতা (Contradictory Opposition) (A – O, E – I)
৪. অসম বিরোধিতা (Sub-altern Opposition) (A – I, E – O)
বচনের বিরোধিতার প্রকারভেদ গুলির বিস্তারিত আলোচনা করা হল –
বিপরীত বিরোধিতা :
বচনের বিরোধিতার প্রকারভেদ গুলির মধ্যে অন্যতম হল বিপরীত বিরোধিতা।একই উদ্দেশ্য ও একই বিধেয় যুক্ত দুটি সামান্য বচনের মধ্যে কেবল গুণের পার্থক্য বর্তমান থাকে, তাহলে তাদের মধ্যবর্তী সম্পর্ককে বিপরীত বিরোধিতা(Contrary Opposition) বলে। এই সম্বন্ধ একই উদ্দেশ্য এবং একই বিধেয় যুক্ত A এবং E বচনের মধ্যে সংগঠিত হয়। যেমন –
A- সকল কাক হয় কালো, E- কোন কাক নয় কালো।
বচন দুটির মধ্যেকার যে সম্বন্ধ তা হল বিপরীত বিরোধিতার সম্বন্ধ। এই বচন দুটির উদ্দেশ্য ও বিধেয় হল অভিন্ন। বচন দুটি হল সামান্য বচন। বচন দুটির মধ্যে কেবল গুণগত পার্থক্যই রয়েছে।
অধীন বিপরীত বিরোধিতা :
একই উদ্দেশ্য ও একই বিধেয় যুক্ত দুটি বিশেষ বচনের মধ্যে গুণের পার্থক্য থাকলে তখন বচন দুটির পারস্পরিক সম্পর্ককে অধীন বিপরীত বিরোধিতা(Sub-Contrary Opposition) বলে। এক্ষেত্রে I এবং O বচনের মধ্যে পারস্পরিক যে সম্পর্ক তা হল অধীন বিপরীত বিরোধিতা।
যেমন- I- কোন কোন ফুল হয় লাল,
O- কোন কোন ফুল নয় লাল।
বচন দুটির মধ্যে যে প্রকার সম্বন্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে তা হল অধীন বিপরীত বিরোধিতা। কেননা এদের উভয়েই একই উদ্দেশ্য ও বিধেয় যুক্ত এবং এদের উভয়ই বিশেষ বচন। এদের মধ্যে কেবল গুণগত পার্থক্যই বর্তমান রয়েছে।
বিরুদ্ধ বিরোধিতা :
বচনের বিরোধিতার প্রকারভেদ গুলির মধ্যে অন্যতম আরও একটি হল বিরুদ্ধ বিরোধিতা। একই উদ্দেশ্য ও একই বিধেয় যুক্ত একটি সামান্য ও একটি বিশেষ বচনের মধ্যে যখন কেবল মাত্র গুণ ও পরিমাণ উভয়ের পার্থক্য বর্তমান থাকে তখন বচন দুটির পারস্পরিক সম্বন্ধকে বিরুদ্ধে বিরোধীতা (Contradictory Opposition) বলে। A – O এবং E – I বচনের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক তা বিরুদ্ধ বিরোধিতা সম্পর্ক।
যেমন, A- সকল কাক হয় কালো O- কোন কোন কাক নয় কালো
উক্ত বচন দুটির মধ্যে বিরুদ্ধ বিরোধিতার সম্বন্ধ রয়েছে। কেননা এদের উভয়ের মধ্যেই গুণগত ও পরিমানগত উভয় প্রকারের পার্থক্যই পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই A বচন এবং O বচনের মধ্যে বিরুদ্ধ বিরোধীতার সম্পর্ক পরিলক্ষিত হচ্ছে।
অসম বিরোধিতা :
একই উদ্দেশ্য ও একই বিধেয় যুক্ত একটি সামান্য ও একটি বিশেষ বচনের মধ্যে যখন পরিমাণের পার্থক্য থাকে তখন বচন দুটির পারস্পরিক সম্বন্ধকে অসম বিরোধিতা বলে। A,I এবং E,O বচনের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক তা হলো অসম বিরোধিতা(Sub-altern Opposition)।
যেমন – A- সকল জ্ঞানী হয় মানুষ, I- কোন কোন জ্ঞানী হয় মানুষ।
অনুরূপভাবে, E- কোন জ্ঞানী নয় মানুষ, O- কোন কোন জ্ঞানী নয় মানুষ।
অসম বিরোধিতার উদাহরণ রূপে উক্ত বচন গুলির মধ্যে সামান্য বচন ও বিশেষ বচন উভয়ই পরিলক্ষিত হয় এবং পরিমাণের ও পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। প্রথম সারির বচন দুটি সামান্য (A, E) এবং দ্বিতীয় সারির বচন দুটি বিশেষ বচন(I, O) রয়েছে।
উপসংহার
সবশেষে বলা যায় বচন ও তার এই চার প্রকার বিরোধিতার ক্ষেত্রে একই উদ্দেশ্য ও বিধেয় সমন্বিত দুটি বচনের মধ্যে গুণ, পরিমাণ এবং গুণ ও পরিমাণ উভয়গত পার্থক্যের ভিত্তিতে এই চতুষ্কোণ বিরোধিতার (Type of Square of Opposition) প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। বচনের বিরোধিতার প্রকারভেদ এর মাধ্যমে যুক্তিবিজ্ঞানের যুক্তি, বিচার ও বিশ্লেষণ এই প্রক্রিয়া ছাড়া অসম্ভব।
তথ্যসূত্র (References)
- D.J O. Connor : A Critical History of Western Philosophy , The Free Press, 1940
- The Rationalists: J. Cottingham
- The Works of Descartes: Haldane & Ross (eds.)
- Descartes: A. Kenny
- W.T. Stace : A Critical History of Greek Philosophy ,Macmilan & Co. Ltd. New York ,1960( First Edition 1920)
- Leibniz: An Introduction to His Philosophy: N. Rescher
- Internet Sources
প্রশ্ন – বিপরীত বিরোধিতা ও বিরুদ্ধ বিরোধিতার মধ্যে একটি বৈসাদৃশ্য লেখ।
উত্তর – বিপরীত বিরোধিতা ও বিরুদ্ধে বিরোধীতার মধ্যে বৈসাদৃশ্য হল-
i) বিপরীত বিরোধিতার ক্ষেত্রে কেবল সামান্য বচন লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু বিরুদ্ধ বিরোধীতার ক্ষেত্রে সামান্য ও বিশেষ উভয় বচন লক্ষ্য করা যায়।
প্রশ্ন – অসম বিরোধিতা ও অধীন বিপরীত বিরোধিতার একটি বৈসাদৃশ্য লেখ।
উত্তর – অসম বিরোধিতায় দুটি বচনের উদ্দেশ্য ও বিধেয় এক থাকে আবার অধীন বিপরীত বিরোধিতার ক্ষেত্রেও দুটি বচনের উদ্দেশ্য ও বিধেয় একই থাকে। তবে দুটি বিরোধিতার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে তা নিম্নে আলোচনা করা হল-
i) অসম বিরোধিতার ক্ষেত্রে দুটি বচনের একটি সার্বিক ও অন্যটি বিশেষ হয়। কিন্তু অধীন বিপরীত বিরোধিতার ক্ষেত্রে দুটি বচনই বিশেষ বচন হয়।
প্রশ্ন – অসম বিরোধিতার একটি দৃষ্টান্ত দাও।
উত্তর – বচনের বিরোধিতার প্রকারভেদ গুলির মধ্যে অসম বিরোধিতা যেহেতু একটি সামান্য ও একটি বিশেষ বচনের মধ্যে হয় এবং পরিমাণের পার্থক্য বর্তমান থাকে। তাই এই বচন সংগঠিত হয় A – I এবং E – O বচন এর মধ্যে। যেমন-
A- সকল প্রাণী হয় মানুষ, I- কোন কোন প্রাণী হয় মানুষ
E- কোন প্রাণী নয় মানুষ, O- কোন কোন প্রাণী নয় মানুষ
প্রশ্ন – এরিস্টটলের মতে বিরোধিতা বা বিরোধ চতুষ্কোণ কি?
উত্তর – যুক্তিবিজ্ঞানের জনক অ্যারিস্টটল বচনের বিরোধিতার বিষয়টিকে দুভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিপরীত বিরোধিতা ও বিরুদ্ধ বিরোধিতা এই দু প্রকার বিরোধীতাকে স্বীকার করেছেন।
প্রশ্ন – আধুনিক যুক্তিবিজ্ঞানে অ্যারিস্টটলের কোন বিরোধিতাকে অস্বীকার করা হয়েছে?
উত্তর – আধুনিক যুক্তিবিজ্ঞানে অ্যারিস্টটলের বিপরীত বিরোধিতা কে অস্বীকার করা হয়েছে।
প্রশ্ন – অধীন বিপরীত বিরোধিতার একটি দৃষ্টান্ত দাও।
উত্তর – অধীন বিপরীত বিরোধিতার একটি দৃষ্টান্ত হল-
কোন কোন মানুষ হয় কবি- I বচন
কোন কোন মানুষ নয় কবি- O বচন
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy
- বিবর্তন কাকে বলে | দৃষ্টান্ত সহ বিবর্তনের নিয়ম | Rules of Obversion in Philosophy
E বচন এর বিরোধী বচন গুলি কি কি
E বচনের বিরোধী বচন গুলি হল – A, I, O