বচনের বিরোধিতা কাকে বলে | বচনের বিরোধিতা শর্ত | Concept of Opposition of Propositions

পাশ্চাত্য দর্শনের একটি অন্যতম আলোচ্য বিষয় হল বচনের বিরোধিতা (Opposition of Propositions)। সাধারণভাবে দুটি বচনের সত্যতা এবং মিথ্যাত্বের কারনে এই প্রকারের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

বচনের বিরোধিতা | Opposition of Propositions

সাধারণত বচনের বিরোধিতা বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা হল এমন দুটি বচনের মধ্যে সম্বন্ধ থাকবে যেখানে বচন দুটি একই সাথে সত্য হতে পারে না আবার বচন দুটি একই সাথে মিথ্যা ও হতে পারে না।

আবার একই সাথে সত্য হতে পারে না অথবা মিথ্যা হতে পারে না এমন দুটি বচনের মধ্যে বিরোধিতা সম্পর্ক যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি একই সাথে সত্য হতে পারে অথবা একই সাথে মিথ্যাও হতে পারে এমন দুটি বচনের মধ্যেও বিরোধিতার সম্পর্ক থাকবে।

সুতরাং দুটি নিরপেক্ষ বচনের মধ্যে এক বিশেষ সম্বন্ধ কে বচনের বিরোধীতা বলা হয়। বচনের বিরোধীতার সম্বন্ধে আবদ্ধ বচন দুটির মধ্যে যে রূপ সম্বন্ধ থাকা আবশ্যক তা হল বচন দুটির উদ্দেশ্য ও বিধেয় অভিন্ন হতে হবে এবং বচন দুটির মধ্যে গুণগত, পরিমাণগত অথবা গুণ ও পরিমাণ উভয় গত পার্থক্য থাকবে।

বচনের বিরোধিতার সংজ্ঞা

একই উদ্দেশ্য ও একই বিধেয় যুক্ত যেকোনো দুটি বচনের মধ্যে কখনো গুণের পার্থক্য কখনো পরিমাণের পার্থক্য কখনো আবার গুণ পরিমান উভয়ের পার্থক্য থাকে তাহলে বচন দুটির একটিকে অপরটির বিরোধী বচন বলে এবং তাদের মধ্যে যে সম্বন্ধ তাকে বচনের বিরোধিতা বলে।

বচনের বিরোধিতার উদাহরণ

বচনের বিরোধিতার উদাহরণ হল

A (বচন) – সকল যাযাবর হয় অনাবাসী,

I (বচন) – কোন কোন যাযাবর হয় অনাবাসী।

দুটি নিরপেক্ষ বচনের ভিন্ন ভিন্ন বা আলাদা উদ্দেশ্য ও বিধেয় থাকলে তাদের মধ্যে কোন প্রকার যৌক্তিক সম্বন্ধ থাকে না।

যেমন-  (A) সকল  পরিশ্রমী হয় মানুষ।

(I) কোন কোন ধার্মিক ব্যক্তি হয় সুখী। 

বচন দুটির মধ্যে উদ্দেশ্য ও বিধেয় দুটি আলাদা হওয়ায় এদের মধ্যে কোন যৌক্তিক সম্বন্ধ নেই। এখানে একটি বচন থেকে অন্য বচনটি কোনভাবেই নিঃসৃত হয় না এবং একটি বচনের সত্যতা থেকে বা  মিথ্যাত্ব থেকে অন্যটি্র সত্যতা বা মিথ্যাত্ব নির্ণয় করা সম্ভব নয়।সুতরাং যুক্তিবিজ্ঞানে দুটি নিরপেক্ষ বচনের মধ্যেকার এক বিশেষ সম্বন্ধেকে বচনের বিরোধিতা বলা হয়।

বচনের বিরোধিতার শর্ত

বচনের বিরোধিতার শর্তগুলি নিম্নলিখিত-

1. দুটি নিরপেক্ষ বচনের মধ্যে এই সম্বন্ধ হতে হবে।

2. বচন দুটির উদ্দেশ্য ও বিধেয় অভিন্ন হতে হবে।

3. বচন দুটির মধ্যে গুণের কিংবা পরিমাণের অথবা গুণ ও পরিমাণ উভয়ের পার্থক্য থাকতে হবে।

সুতরাং, প্রথমতঃ বিরোধিতার সম্বন্ধ তৈরি হতে গেলে বচন দুটিকে নিরপেক্ষ হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে ‘সকল যাযাবর হয় অনাবাসী‘ এবং ‘কোন কোন যাযাবর হয় অনাবাসী‘। বচন দুটি নিরপেক্ষ এবং এদের মধ্যে বিরোধীতার সম্বন্ধ বর্তমান।

দ্বিতীয়তঃ বচন দুটির উদ্দেশ্য ও বিধেয় অভিন্ন হতে হবে। কারণ উদ্দেশ্য ও বিধেয় যদি ভিন্ন হয় তাহলে তাদের মধ্যে যৌক্তিক সম্বন্ধ আছে বলা যাবে না। তাদের একটির সত্যতা বা মিথ্যাত্ব থেকে অন্যটির সত্যতা বা মিথ্যাত্ব নির্ণয় করা যায় না।

উদাহরণস্বরূপ-

সকল কবি হয় দার্শনিক (A)

কোন কবি নয় দার্শনিক (E)

বচন দুটির মধ্যে যৌক্তিক সম্বন্ধ বর্তমান। কেননা এদের উদ্দেশ্য ‘কবি’ ও বিধেয় ‘দার্শনিক ‘ অভিন্ন এবং এদের একটির সত্যতা বা মিথ্যাত্ব থেকে অন্যটি সত্যতা বা মিথ্যাত্ব অনুমান করা যায়। কাজেই বচনের বিরোধিতার ক্ষেত্রে বচন দুটির উদ্দেশ্য ও বিধেয় অভিন্ন হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বচন দুটির উদ্দেশ্য ও বিধেয় যদি ভিন্ন হয় তাহলে একটির সত্যতা থেকে অন্যটি সত্যতাকে নির্ণয় করা যাবে না।

তৃতীয়তঃ বচন দুটির মধ্যে গুণগত বা পরিমাণগত অথবা গুণ ও পরিমাণ উভয়গত দিক থেকে পৃথক হতে হবে তবেই বচন দুটির মধ্যে বিরোধিতা সম্বন্ধে স্থাপিত হবে।

উদাহরণস্বরূপ-

কোন মানুষ নয় সুখী ব্যক্তি (E)

কোন কোন মানুষ হয় সুখী ব্যক্তি (I)

বচন দুটির মধ্যে বিরোধিতার সম্বন্ধ রয়েছে। কেননা বচন দুটির মধ্যে গুণগত এবং পরিমাণগত উভয় পার্থক্য রয়েছে। প্রথম বচনটির ‘কোন’ – ‘নয়’ এবং দ্বিতীয় বচনটি ‘কোন কোন’- ‘হয়’ এদের মধ্যে এইরূপ প্রকারে গুণগত এবং পরিমাণগত পার্থক্য বর্তমান।

উপসংহার

সবশেষে বলা যায় যে, যদি একই উদ্দেশ্য ও বিধেয় যুক্ত দুটি নিরপেক্ষ বচনের মধ্যে গুণ, পরিমাণ, অথবা গুণ ও পরিমাণ উভয় গত পার্থক্য থাকে তাহলে ওই বচন দুটির পারস্পরিক সম্বন্ধ বিরোধিতার এরূপ বলা যায়। এছাড়াও বচনের বিরোধীতার ক্ষেত্রে উপরিউল্লিখিত শর্তগুলি বচনের বিরোধিতার আবশ্যিক শর্ত এবং এগুলি ছাড়া দুটি নিরপেক্ষ বচনের মধ্যে বিরোধিতা সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।

আরোও পড়ুন – Click here

তথ্যসূত্র (References)

  • History of Modern Philosophy: R. Falckenberg
  • Encyclopedia of Philosophy: P. Edwards (ed.)
  • The Greek Philosophers from Thales to Aristotle: W. K. C. Guthrie
  • F. Copleston : A History of Philosophy, Paulist Press,, US, 1946, 1975
  • C.R Morris : Locke, Berkeley and Hume , Greenwood Press, 1980
  • A Critical History of Modern Philosophy: Y.H. Masih
  • Falckenberg : History of Modern Philosophy, Project Gutenberg, 1920
  • History of Western Philosophy: B. Russell
  • D.J O. Connor : A Critical History of Western Philosophy , The Free Press, 1940
  • Internet Sources

প্রশ্ন – বচনের বিরোধিতা একটি বৈশিষ্ট্য লেখ

উত্তর – বচনের বিরোধিতার একটি বৈশিষ্ট্য হল-
বচন দুটির মধ্যে গুণের কিংবা পরিমাণের অথবা গুণ ও পরিমাণ উভয়ের পার্থক্য থাকতে হবে।

প্রশ্ন – বিরুদ্ধ বিরোধিতা কখন হয়?

উত্তর – একই উদ্দেশ্য ও একই বিধেয় যুক্ত একটি সামান্য ও একটি বিশেষ বচনের মধ্যে যখন কেবল মাত্র গুণ ও পরিমাণ উভয়ের পার্থক্য বর্তমান থাকে তখন বচন দুটির পারস্পরিক সম্বন্ধ বিরুদ্ধ বিরোধীতা।

প্রশ্ন – অসম বিরোধিতার সত্যতার নিয়মটি কি?

উত্তর – একই উদ্দেশ্য ও একই বিধেয় যুক্ত একটি সামান্য ও একটি বিশেষ বচনের মধ্যে যখন পরিমাণের পার্থক্য থাকে তখন বচন দুটির পারস্পরিক সম্বন্ধকে অসম বিরোধিতা বলে।