যুক্তিবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হল যুক্তি।বচনের দ্বারা যুক্তির আকার কে গঠন করা হয়।সেহেতু বচন কাকে বলে (Definition of proposition) বচনের বৈশিষ্ট্য ও উদাহরন ইত্যাদি আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টিকে বিস্তারিত করা হল।
যুক্তিবিদ্যার মুখ্য আলোচ্য বিষয় হল যুক্তি আকারের বৈধতা ও অবৈধতা বিচার করা। বাক্য গঠনের জন্য দুই বা ততোধিক ধারণাকে পারস্পরিক তুলনার মাধ্যমে সংযুক্ত করতে হয় এবং বচনের ক্ষেত্রেও এরূপ তুলনা আবশ্যক।
বচন কাকে বলে | Definition of Proposition
যে বাক্য সত্য বা মিথ্যা হয় তাকে বচন বলে। বচনে দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই সম্বন্ধটি শর্ত নিরপেক্ষ বা শর্তসাপেক্ষ হতে পারে।যুক্তির অবয়ব হিসেবে ব্যবহৃত হয় বচন। ।
Aristotle -এর মতে বচন বা তর্ক বাক্য হল ভাষায় প্রকাশিত অবধারণ। অবধারণ হল একপ্রকার মানসিক ক্রিয়া। এই মানসিক ক্রিয়ার সাহায্যে আমরা দুটি সামান্য ধারণাকে মনে মনে তুলনা করি। এবং তাদের মধ্যে একটি সম্বন্ধ আমরা গড়ে তুলি। এই সম্বন্ধটি সদর্থক হতে পারে অথবা নঞর্থক হতে পারে।
যেমন – ‘মানুষ’ ও ‘মরণশীল’ এই দুটি বিষয়ের ধারণা আমাদের মনে ছিল। এই দুটি ধারণাকে যখন আমরা পরস্পর তুলনার মাধ্যমে একটা সম্বন্ধে আবদ্ধ করি, তখন সেটি আমরা অবধারণ বলি।
পরবর্তিতে ভাবনা গুলিকে যখন ‘মানুষ হয় মরণশীল’ এভাবে ভাষায় প্রকাশ করি, তখন সেটিকে বচনের রূপে আমরা প্রকাশ করি। এজন্য তাই বলা যায় বচন হল ভাষায় প্রকাশিত এক অবধারণ।
বচন সত্য বা মিথ্যা হয়। বচনের বক্তব্য বিষয় এর সঙ্গে যদি বাস্তব জগতের মিল থাকে তবে বচন সত্য হয়, মিল না থাকলে বছর মিথ্যা হয়। ‘পাথর বাটি টি হ্য় স্বর্ন নির্মিত’ এই বচনটি মিথ্যা। কারণ এই বচনের বক্তব্য বিষয়ের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। আবার ‘পাথর বাটি টি হ্য় পাথর নির্মিত’ এই বচনটি সত্য। কারণ বচনের বক্তব্য বিষয়ে সঙ্গে বাস্তবের মিল আছে।
বাক্যের মাধ্যমে বচন প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সব বাক্য বচন প্রকাশ করে না। একমাত্র ঘোষক বাক্য বচন প্রকাশ করে। অর্থহীন বাক্য আছে, কিন্তু অর্থহীন বচন নেই। এইজন্য বলা যায় যে ঘোষক বাক্যে যা প্রকাশিত হয় তাই বচন।
অনুমানের ভাষায় প্রকাশিত রূপ হল যুক্তি। যুক্তির দুটি দিক আছে, একটি উপাদান অপরটি আকার। যুক্তির বক্তব্য বিষয় হল উপাদান। উপাদানকে যেভাবে প্রকাশ করা হয় সেটা হল যুক্তির আকার। যুক্তির আকারের বৈধতা অবৈধতা বিচার করাই হল যুক্তিবিদ্যার কাজ। আর এই যুক্তির আকারকে গঠন করা হয় বচনের মাধ্যমে।
বচনের বৈশিষ্ট্য
বচনের ক্ষেত্রে যেমন উদ্দেশ্য ও বিধেয়র মধ্যে এক প্রকার সম্বন্ধ পরিলক্ষিত হয়। ঠিক তেমনি বাক্যের ক্ষেত্রেও উদ্দেশ্য ও বিধেয়র মধ্যে ও এক প্রকার সম্বন্ধ পরিলক্ষিত হয়। বচন বাক্যের তর্ক বিজ্ঞানসম্মত রূপ হলেও বচনের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। বচনের বৈশিষ্ট্য গুলি নিম্নরূপ –
১) শুধুমাত্র উদ্দেশ্য অথবা বিধেয়কে নিয়ে বচন গঠিত হয় না। একটি উদ্দেশ্য ও একটি বিধেয় থাকে প্রত্যেকটি বচনে।
২) উদ্দেশ্য ও বিধেয়র সম্বন্ধ শর্তাধীন অথবা শর্তহীন হতে পারে। অর্থাৎ উদ্দেশ্য এবং বিধেয়র মধ্যে যে সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হয় তা শর্ত সাপেক্ষভাবে হতে পারে আবার শর্ত নিরপেক্ষভাবে হতে পারে।
৩) বাক্য হল বচনের মূল উৎস। তাই বাক্যকেই বচনের ভিত্তি বলা হয়ে থাকে। বাক্য ছাড়া বচনের কোন অস্তিত্ব থাকতে পারে না।
৪) বচনের প্রকৃতি বা স্বরূপের মধ্যেই যুক্তির স্বরূপ বা প্রকৃতি নির্ভর করে। তাই বচন হল যুক্তির প্রকৃতি বা স্বরূপ নির্ধারক।
৫) যেকোনো বাক্যে উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের মধ্যে একটি সম্বন্ধ ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য এবং বিধেয় যে পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয় সেই বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয়।
৬) উদ্দেশ্য ও বিধেয়র মধ্যে যে সম্বন্ধ তাকে দু ভাবে স্থাপন করা হয়ে থাকে সদর্থক এবং নঞর্থক ভাবে।
৭) বচনের সঙ্গে সত্যতার প্রশ্নটি অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। যেহেতু প্রত্যেকটি বচনই হয় সত্যরূপে গণ্য হবে অথবা মিথ্যারূপে গণ্য হবে। সত্য ও মিথ্যা হওয়া ছাড়া বচনের আর তৃতীয় কোন শর্ত থাকে না।
৮) যুক্তি গঠিত হয় শুধুমাত্র বচন দিয়ে। তাই যে কোন বচনই যুক্তির উপাদান বা অবয়ব রূপে গণ্য হতে পারে। সুতরাং বচন গুলি যুক্তির অংশ রূপে বিবেচিত হয়।
৯) বচন ব্যবহারের পরিধি বাক্যের ব্যবহারের পরিধি অপেক্ষা অনেকটা কম। বচনকে আমরা শুধুমাত্র তর্কবিদ্যায় যুক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর কোন প্রয়োগ দেখা যায় না।
১০) বচনের সত্য-মিথ্যার সাহায্যেই যুক্তির বৈধতা নির্ণয় করা যেতে পারে। অর্থাৎ বচনের সত্যতার উপর যুক্তির বৈধতা নির্ভরশীল।
১১) সকল বচনই বাক্য রূপে গণ্য হলেও, সব বাক্য কখনোই বচন বলে গণ্য হতে পারে না।
বচনের উদাহরন
উপরে আমরা বচন কাকে বলে (Definition of Proposition) এবং বচনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তাই উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বচনের কিছু উদাহরণ নিম্নরূপ –
১) একটি উদ্দেশ্য ও একটি বিধেয় থাকে প্রত্যেকটি বচনে।যেমন- ‘রাম হয় মানুষ‘। এখানে ‘রাম’ হল উদ্দেশ্য পদ এবং ‘মানুষ’ হল বিধেয় পদ।
২) বচনে উদ্দেশ্য ও বিধেয়র মধ্যে একটি সম্বন্ধ ঘোষণা করা হয়।যেমন- ‘সকল দার্শনিক হয় চিন্তাশীল‘।
৩) বচনে উদ্দেশ্য ও বিধেয়র মধ্যে সম্বন্ধ দু ভাবে স্থাপন করা হয়ে থাকে সদর্থক এবং নঞর্থক ভাবে।যেমন- ‘কাক হয় কালো’ এবং ‘কাক নয় কালো’। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ‘কাক’ এবং বিধেয় ‘কালো’ এদের মধ্যে ‘হয়‘ অর্থাৎ সদর্থক অর্থে এবং ‘নয়‘ এটি নঞর্থক ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে, আমরা বচন তাকেই বলব যে বাক্য সত্য অথবা মিথ্যা হবে এবং দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্বন্ধ ঘোষণা করবে। যদিও এই সম্বন্ধ শর্তসাপেক্ষ অথবা শর্ত নিরপেক্ষ হতে পারে। সর্বোপরি আরও বলা যায়, বচন (Definition of Proposition) ছাড়া যুক্তিবিজ্ঞানে যুক্তির আকারগত বৈধতা ও অবৈধতা নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
তথ্যসূত্র (References)
- History of Modern Philosophy: R. Falckenberg
- Encyclopedia of Philosophy: P. Edwards (ed.)
- The Greek Philosophers from Thales to Aristotle: W. K. C. Guthrie
- F.Copleston : A History of Philosophy, Paulist Press,, US, 1946, 1975
- C.R Morris : Locke, Berkeley and Hume , Greenwood Press, 1980
- A Critical History of Modern Philosophy: Y.H. Masih
- Falckenberg : History of Modern Philosophy, Project Gutenberg, 1920
- History of Western Philosophy: B. Russell
- Internet Sources
প্রশ্ন – বিরোধানুমান কয় প্রকার ও কি কি?
উত্তর – বিরোধানুমান চার প্রকার – ১) বিপরীত বিরোধানুমান ২) অধীন-বিপরীত বিরোধানুমান ৩) বিরুদ্ধ বিরোধানুমান ৪) অসম বিরোধানুমান ।
প্রশ্ন – বিপরীত বিরোধিতার সত্যতার নিয়ম।
উত্তর – একই উদ্দেশ্য ও একই বিধেয় যুক্ত দুটি সামান্য বচনের মধ্যে কেবল গুণের পার্থক্য বর্তমান থাকলে বিপরীত বিরোধিতা হয়।
প্রশ্ন – সদর্থক বচন কাকে বলে ?
উত্তর – যে নিরপেক্ষ বচনে উদ্দেশ্য পদ নির্দেশিত শ্রেণীটি বিধেয় পদ নির্দেশিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন সেই নিরপেক্ষ বচনকে সদর্থক বলা হয়।
প্রশ্ন – নঞর্থক বচন কাকে বলে ?
উত্তর – নিরপেক্ষ বচনের উদ্দেশ্য পদ নির্দেশিত শ্রেণীটি বিধেয় পদ নির্দেশিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয় অর্থাৎ বিধেয় পদ নির্দেশিত শ্রেণীর বহির্ভূত হয়, তখন সেই বচনকে নঞর্থক বলা হয়।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy
1 thought on “বচন কাকে বলে উদাহরন দাও | Definition of Proposition with Example”