রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ (Tagore Humanism) হল মানুষে মানুষে ভালোবাসা, তার প্রতি সহানুভূতি এবং ঐক্যের এক কেন্দ্রবিন্দু। যাকে কেন্দ্র করে এক সুসম্পর্কিত জগৎ বৈচিত্র্য নির্মাণ হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ | Tagore Humanism
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদের (Tagore Humanism) কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যেগুলি নিম্নে আলোচিত হল –
মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও গভীর প্রেম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি সর্বদা গভীর প্রেমে বিশ্বাসী ও সহানুভূতিকেই সর্বস্তরে প্রয়োগে উৎসাহী ছিলেন। তিনি মনে করতেন ভালবাসার দ্বারা সকল বিবাদ ও বিদ্বেষকে জয় করা সম্ভব। মানুষে মানুষে সম্পর্ক এবং ভালোবাসা প্রত্যেকটি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাই তিনি মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও গভীর প্রেমে সর্বদা বৈশিষ্ট্যবান ছিলেন।
পুরুষ ও নারীর সমমর্যাদা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদের (Tagore Humanism) উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো পুরুষ ও নারীর মধ্যেকার বিভেদ দূরীকরণ এবং তাদের মধ্যে সমতার স্বীকৃতি। তার মানবতাবাদী দর্শন এ নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই তার কাছে সবাই সমান। পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনরূপ ভেদাভেদ তিনি মান্যতা দেননি। এখানেই তার মানবতাবাদী হৃদয়ের পরিচয় পাওয়া যায়।
জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদী (Tagore Humanism) চিন্তায় অনন্য সব ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল জাতিকে সমান অধিকারের কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন জাত-পাত, ধর্ম-ভেদাভেদ, লিঙ্গ-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ। সবার উপর মানুষ সত্য একথা তিনি তার কর্মের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন।
মানবতা জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ (Tagore Humanism) সমস্ত রকমের জাতীয়তাবাদীর ঊর্ধ্বে। তিনি মনে করতেন জাতীয়তাবাদ কখনো মানবতাবাদকে অতিক্রম করতে পারেনা। তার কাছে মানবতাবাদী শ্রেষ্ঠ। যে শ্রেষ্ঠত্ব জাতীয়তাবাদকেও অতিক্রম করে যেতে পারে।, জাতিগত ভেদাভেদ বিসর্জন দিয়ে সকল মানুষের মধ্যে ভালোবাসাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারলেই মানবতার সফলতা নিশ্চিত।
ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতা
রবীন্দ্রনাথের মতে মানবতা (Tagore Humanism) ধর্মকেও অতিক্রম করে যায়। কারণ ধর্ম মানুষে মানুষে ভেদাভেদ একে অন্যের প্রতি ঘৃণা ও মতবিরোধিতার জন্ম দেয়। কিন্তু মানবতা সে সমস্ত বিধ্বংসী বিষয়কে ছাপিয়ে প্রেম সহানুভূতি ও ভালবাসাকে স্থান দেয়। তাই শান্তির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মানবিকতাই সমস্ত রকম ধর্মের ঊর্ধ্বে বিরাজ করে।
প্রকৃতি প্রেম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতি প্রেম ছিল অনবদ্য। তিনি মানব সমাজকে যেমন উদ্বুদ্ধ করেছেন ঠিক তেমনি প্রকৃতির প্রতি প্রেম ও তার অপরিসীম। তার শৈশব থেকে প্রকৃতির প্রতি প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে তার বহু লেখনীতে। প্রকৃতির দিকে চেয়ে সময় কাটানো, প্রকৃতিকে নিয়ে লেখা বহু কথা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা তিনি তার ভাবধারায় প্রকাশ করেছেন।
সংস্কৃতি ও শিল্পের মাধ্যমে মানবতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সংস্কৃতি ও শিল্পের মাধ্যমে মানবতাকে তুলে ধরেছেন। তিনি তার বিভিন্ন গান, গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস এবং নানা প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি মানবতাকে বিশ্বের দরবারে উত্থাপিত করেছেন। তিনি এই সমস্ত বিষয়গুলির মাধ্যমে সমস্ত মানুষ জাতির প্রতি তার চিন্তা, ভাবনা ও বার্তা প্রেরণ করার চেষ্টা করেছেন।
কর্মই মানবতার প্রকাশ
তিনি মনে করতেন শিক্ষাগত যোগ্যতা বা জ্ঞান থাকলেই কেবল মানবতাকে উন্মোচিত করা যায় না। তার মতে কর্মের দ্বারা মানবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যায়। জ্ঞান বা আলোচনা নয় নিজের কর্মের মাধ্যমেই মানবতা বিকশিত হয়ে থাকে। মানবতার বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কাজ ও কর্মের দ্বারা মানুষের প্রতি ভালবাসাকে বিস্তার করা সম্ভব।
মানবতা বোধের শিক্ষা
রবীন্দ্রনাথের মানবতা (Tagore Humanism) কেবল পরিসর গণ্ডিতে সীমিত বা সীমাবদ্ধ নয়।, তার চিন্তা ভাবনা ও তার প্রয়োগ অপরিসীম। তিনি মনে করতেন যে মানবতাবাদের শিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ শিক্ষা ব্যতীত কোন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান হওয়া সম্ভব নয়। তাই আচার ব্যবহার এবং নিজের মধ্যেকার মানবতা ভালোবাসা ইত্যাদির জন্য মানবতা বোধের শিক্ষার প্রয়োজন।
সার্বজনীন মানবতা
রবীন্দ্রনাথের সার্বজনীন মানবতা এক বৈচিত্র্যপূর্ণ পৃথিবীর রূপকার বলা যেতে পারে। তিনি সকল মানুষের প্রতি সুসম্পর্ক, ভালোবাসা, স্নেহ, ভাতৃত্ববোধ ও সমস্ত ভেদাভেদ মুক্ত সমাদর সম্পর্ককে সর্বদা কামনা করতেন। তিনি মনে করতেন সকল মানুষের প্রতি সমানভাবে সহানুভূতি ও ভালোবাসাকে ব্যবহার করা প্রয়োজন। যেখানে মানবতা হবে সার্বজনীন। কোন ব্যক্তিভেদে নয়, মানবতা হল সামগ্রিক।
উপসংহার
উপরোক্ত আলোচনাগুলি থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ (Tagore Humanism) হল সার্বজনীন, সামগ্রিক ও সমস্ত প্রকার জীবের প্রতি এক ভালবাসার উপাখ্যান। যেখানে ধনী-গরীব, উচ্চ-নিচ, ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি সমস্ত প্রকারকে ছাপিয়ে তার মানবিকতার প্রতীক ভালোবাসার উদগীরণ ঘটেছে।
তথ্যসূত্র (References)
- Radhakrishnan, S.1919. The Philosophy of Rabindranath Tagore. London Macmillian and Co.
- Conflict Resolution and Gandhian Ethics –Thomas Weber, Gandhi Peace Foundation, New Delhi, 1991.
- Peace Education: The Concept, Principles and Practices around the World – (eds.) Gabriel Solomon and Baruch Nevo, .
- Comprehensive Peace Education—Betty Reardon, Teachers College Press, 1988.
- Philosophical Perspectives of Peace – Howard P. Kainz
- Peace, War and Defence – (ed.) Johan Galtung
- Internet Sources
প্রশ্ন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম কত সালে?
উত্তর – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ২৫শে বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দে কলকাতায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে।
প্রশ্ন – কত সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পান?
উত্তর – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy