বাচনিক জ্ঞানের স্বরূপ হিসেবে ‘জানা’র তৃতীয় শর্তটিকে দুটি ভিন্নভাবে গ্রহণ করে ‘জানা’ ক্রিয়াপদটির দুটি ভিন্ন অর্থ উল্লেখ করা হয় – সবল ও দুর্বল অর্থে ‘জানা’ (Strong and weak sense of ‘know’)।
জানার তিনটি শর্ত পূরণের মাধ্যমে আমরা এমনটা বলতে পারি যে আমরা কোন কিছুকে ‘জেনেছি’ বা ‘জানি’। ‘জানা’র এই তিনটি শর্ত হল – ১. সত্যতার শর্ত ২. বিশ্বাসের শর্ত ৩. বিশ্বাসের সমর্থনে তথ্য, যুক্তি, সাক্ষ্য-প্রমাণ।
সবল ও দুর্বল অর্থে ‘জানা’ | Strong and weak sense of ‘know’
‘জানা’ ক্রিয়া পদটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। রোজকার জীবনে আমরা অনেক কিছু ‘জানি’ বলে থাকি। এসব আমাদের নিছক বিশ্বাস বা আন্দাজ করা নয়, এসব আমরা জানি।
যেমন – ‘ভারী বস্তু তুলতে অধিক কষ্ট হয়’, ‘দুধের রং সাদা’, ‘আমরা হাঁটতে ও চলতে জানি’ এমন অনেক কিছু আমরা জানি।
এই যে ‘জানা’ এর তিনটি শর্ত পূরণ হলে আমরা বলি যে কোন কিছুকে ‘জেনেছি’। শর্ত তিনটি হল – সত্যতার শর্ত, বিশ্বাসের শর্ত, বিশ্বাসের সমর্থনে তথ্য, যুক্তি, সাক্ষ্য-প্রমাণ।
জানার যে বিষয় বচন তাকে সত্য হতে হবে। বচনটির সত্যতা সম্পর্কে বিশ্বাস থাকতে হবে এবং বিশ্বাসের সমর্থনে উপযুক্ত যুক্তি বা প্রমাণ থাকতে হবে।
‘জানা’ শব্দটি এই অর্থে গ্রহণ করে আমরা বলি আমরা জানি যে ভারী বস্তু তুলতে অধিক কষ্ট হয়, আমরা জানি যে দুধের রং সাদা, ‘আমরা হাঁটতে ও চলতে জানি’ ইত্যাদি।
সংশয়বাদীরা আমাদের এই প্রকার জানাকে সঠিক অর্থে ‘জানা’ বলেননি। ‘জানা’র তৃতীয় শর্তটিকে দুটি ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করে ‘দুর্বল অর্থে জানা’ এবং ‘সবল অর্থে জানা’ (Strong and weak sense of ‘know’) এভাবে দুটিকে বিন্যাস করেছেন।
‘সবল অর্থে জানা’ ও ‘দুর্বল অর্থে জানা’র ক্ষেত্রে বিশ্বাসের সমর্থনে কিছু সংখ্যক সাক্ষ্য প্রমাণ কে যদি উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে বলা হয় ‘জেনেছি’, তাহলে তা হবে ‘দুর্বল অর্থে জানা‘ আর বিশ্বাসের সমর্থনে কিছু সংখ্যক সাক্ষ্য প্রমাণকে যদি উপযুক্ত বা পর্যাপ্ত রূপে গ্রহণ না করে চূড়ান্ত সাক্ষ্য প্রমাণের অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্য প্রমাণের অনুসন্ধান করা হয়, তাহলে সেই ‘জানা’ হবে ‘সবল অর্থে জানা‘।
কিছু সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা গেলেই ‘দুর্বল অর্থে জানা’র ক্ষেত্রে বলা যাবে ‘জেনেছি’।কিন্তু ‘সবল অর্থে জানা’র ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা না হলে তা আর ‘জেনেছি’ বলা যাবে না।
বিশ্বাসের সত্যতা প্রসঙ্গে যথেষ্ট যুক্তি থাকলে তাদের জোরালো যুক্তি রূপে গণ্য করে ‘জেনেছি’ বা ‘জানি’ বলে থাকি।আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে এবং বিজ্ঞানে আমরা সাধারণত দুর্বল অর্থেই ‘জানা’ শব্দটিকে ব্যবহার করে থাকি।
যেমন – নিজের বাড়িতে বসে আমি এখন বলতে পারি, ‘আমি জানি যে আমার বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের সামনের দিকে থাকা শিক্ষক মহাশয়ের চেয়ারটি এখনো সেখানে উপস্থিত আছে’। আমার এই ‘জানা’কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমি বলতে পারি যে, জ্ঞান হতে গেলে যে তিনটি শর্তের প্রয়োজন তার প্রত্যেকটি এখানে পূরণ করা হয়েছে।
প্রথমতঃ যাকে ‘জানি’ বলে দাবী করছি সেই ( ‘আমি জানি যে আমার বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের সামনের দিকে থাকা শিক্ষক মহাশয়ের চেয়ারটি এখনো সেখানে উপস্থিত আছে’) বচনটি সত্য।
দ্বিতীয়তঃ আমি বিশ্বাস করি যে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের সামনের দিকে থাকা শিক্ষক মহাশয়ের চেয়ারটি এখনো সেখানে উপস্থিত আছে।
তৃতীয়তঃ আমার বিশ্বাসের সমর্থনে জোরালো যুক্তি বা সাক্ষ্য প্রমাণও আমার আছে যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের সামনের দিকে থাকা শিক্ষক মহাশয়ের চেয়ারটি দেখে আসছি এই কিছুক্ষণ আগে স্কুল ছুটি হওয়ার সময় তা সেখানে থাকতে দেখেছি।
সংশয়বাদীরা মনে করেন ‘দুর্বল অর্থে জানা’ একটি দৃঢ় বিশ্বাস মাত্র। ‘সবল অর্থে জানাই’ হল আসলে সঠিক অর্থে ‘জানা’। এদের অভিমত হল উপরোক্তক্ষেত্রে জানার তৃতীয় শর্তটি সম্পর্কে অর্থাৎ বিশ্বাসের সমর্থনে যুক্তি বা প্রমাণ সম্পর্কে সংশয় দেখা দেয়।
সংশয়বাদীদের তৃতীয় শর্তটি সম্পর্কে অভিমত এই যে, বিশ্বাসের সমর্থনে সাক্ষ্য প্রমাণ চূড়ান্ত না হলে বিশ্বাসটি জ্ঞানে উত্তীর্ণ হতে পারে না।
কিছু সাক্ষ্য প্রমাণ আমাদের অগোচরে থেকে যেতে পারে এমন সম্ভাবনাকে আমরা একেবারে বাতিল করতে পারিনা। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের সামনের দিকে থাকা শিক্ষক মহাশয়ের চেয়ারটি এখনো সেখানে উপস্থিত আছে এই বিশ্বাসটি সমর্থনে আমি উল্লেখ করতে পারলেও তা সম্পূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ নয়।
নিজের বাড়িতে বসে আমি যখন শ্রেণিকক্ষের সামনের দিকে থাকা শিক্ষক মহাশয়ের চেয়ারটি দেখতে পাচ্ছি না আমার অগোচরে তখন নিশ্চিতভাবে এমন বলতে পারি না যে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের সামনের দিকে থাকা শিক্ষক মহাশয়ের চেয়ারটি এখনো সেখানে উপস্থিত আছে।
এমনও হতে পারে। অন্তত এমন হওয়াটা একেবারে অসম্ভব নয় যে আমি যখন স্কুল ছুটির পর বাড়িতে এসেছি ঠিক তারপর চেয়ারটিকে ওই স্থান থেকে অন্য জায়গা স্থানান্তরিত করা হয়েছে বা স্কুলের শ্রেণিকক্ষে, এখনই গেলে আমি আর সেই চেয়ারটিকে দেখতে পাবো না।
সংসয়বাদীর এখানে আমার বিশ্বাসের সমর্থনে যুক্তি বা সাক্ষ্য প্রমাণ অস্বীকার করেন না, তারা বলেন যে বিশ্বাসের সমর্থনে আমার যুক্তিগুলি যথেষ্ট ভালো যুক্তি বা উত্তম যুক্তি হলেও তা পর্যাপ্ত যুক্তি নয়। কাজেই আমরা বা আমার ওই ‘জানা’টা নেহাতই একটা বিশ্বাস অর্থাৎ ‘দুর্বল অর্থে জানা’ তা কিন্তু ‘সবল অর্থে জানা’ নয়।
অধ্যাপক হসপার্স একটি দৃষ্টান্তের সাহায্যে সবল ও দুর্বল অর্থে ‘জানা’র (Strong and weak sense of ‘know’) পার্থক্যকে ব্যাখ্যা করেছেন –
ধরাযাক নিয়মমাফিক আমার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে কোন ডাক্তার উত্তেজিতভাবে আমাকে জানালেন যে এক্সরে ছবিতে আমার হৃদপিন্ডের ছবি ওঠেনি, অর্থাৎ আমার হৃদপিণ্ড নেই। ডাক্তারের কথা শুনে আমি বিস্মিত হলেও কথাটিকে আমি সত্য বলে মেনে নিতে পারি না, কেননা হৃদপিন্ডের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমি সুনিশ্চিত। প্রতিনিয়ত আমি তা অনুভব করি এবং আমার হৃদস্পন্দন আমার হৃদপিন্ডের অস্তিত্বকে প্রমাণ করে। তাছাড়া আমার দেহে যে রক্ত সঞ্চালন হয়ে চলেছে, হৃৎপিণ্ড না থাকলে সেটাও সম্ভব হতো না। কাজেই আমি এটা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি, ‘আমি যে আমার হৃদপিণ্ড আমার মধ্যেই অবস্থান করছে’।
এবার ধরা যাক, বুকে আঘাত জনিত কারণে আমার বক্ষপিঞ্জরে অস্ত্রোপ্রচারের প্রয়োজন হল এবং অস্ত্রোপ্রচারে করতে গিয়ে শল্য চিকিৎসক আমার বক্ষপিঞ্জরে অথবা দেহের অন্য কোন অংশে হৃদপিণ্ডে সন্ধান পান না, তারা আমার এই দেহের অভ্যন্তরে যে সব ছবি তোলেন তাদের একটিতেও আমার হৃদপিন্ডের ছবি পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে আমি বলতে পারব না যে ‘আমি জানি আমার হৃদপিণ্ড আছে’। বরং এরূপ পরিস্থিতিতে এমন বলতে বাধ্য হব যে, আমার আগের ‘জানা’ টা একটা বিশ্বাস মাত্র। সে বিশ্বাসে সমর্থনে কিছু যুক্তি থাকলেও তা সর্বাঙ্গীন চূড়ান্ত নয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে আমার ‘জানা’টা ছিল ‘দুর্বল অর্থে জানা’ তা একেবারেই ‘সবল অর্থে জানা’ নয়।
আমাদের এসব জানা সম্পর্কে উপযুক্ত যুক্তি, তথ্য ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি আমাদের এই ‘জানা’ প্রসঙ্গে সংশয় প্রকাশ করে তাহলে বুঝতে হবে যে, এমন ক্ষেত্রে ‘জানা’ প্রসঙ্গে বিতর্কটা নেহাতই শাব্দিক।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে, সবল অর্থে ও দুর্বল অর্থে ‘জানা’র (Strong and weak sense of ‘know’) ক্ষেত্রে নানান জটিলতা থাকলেও বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক কিছুকে জানি বলে দাবি করে থাকি। সেসবের বেশিরভাগই নেহাতই এক প্রকারের দুর্বল অর্থে ‘জানা’। সবল অর্থে জানতে হলে সে জানার সমর্থনে উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ থাকা আবশ্যক।
তথ্যসূত্র (References)
- The Fundamental Questions of Philosophy: A. C Ewing
- The Fundamentals of Philosophy: D. L. Das
- Problems of Philosophy: G Watts Cunnigham
- A History of Modern Philosophy: W. K. Wright
- Internet Sources
প্রশ্ন – আবশ্যিক পর্যাপ্ত শর্তের উদাহরণ লেখ।
উত্তর – আবশ্যিক পর্যাপ্ত শর্তের একটি উদাহরণ হল – ভিজে কাঠে অগ্নিসংযোগ না করলে ধুম উৎপন্ন হবে না এবং ভিজে কাঠের অগ্নিসংযোগ করলে ধুম উৎপন্ন হবে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদ | Discuss the Tagore Humanism
- মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Features of Mahatma Gandhi’s Non-Violence Policy
- কান্টের নৈতিকতা ও শান্তির মধ্যে সম্পর্ক | Kant’s Relationship Between Morality and Peace
- ব্যাপ্তি কাকে বলে | ব্যাপ্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় | What is Vyapti
- দর্শনের স্বরূপ আলোচনা করো | The Nature of Philosophy